১৯৮২ সালের ২২ জানুয়ারি। ইতালির সার্ডিনিয়ার কালিয়ারির একটি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিল ছোট্ট জেসিকা। সার্ডিনিয়ার সংবাদমাধ্যম L’Unione Sarda তাকে আট বছর বয়সী বলে উল্লেখ করেছে। চিকিৎসকেরা মনে করেছিলেন, মেয়েটির হাতে হয়তো আর ২৪ ঘণ্টাও নেই।
তখন এক চিকিৎসকের মনে পড়ে জার্মানিতে তৈরি পরীক্ষামূলক একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের কথা। সেটিই হতে পারে জেসিকার শেষ আশা।
সমস্যা ছিল, ওষুধটি পাওয়া যাচ্ছিল শুধু জার্মানির একটি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে। আর সেদিন জার্মানিজুড়ে ভয়াবহ তুষারপাত ও বরফবৃষ্টিতে সড়ক, রেল ও বেসামরিক বিমান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। জেসিকার চিকিৎসক সাহায্য চান সার্ডিনিয়ার ডেসিমোমান্নু বিমানঘাঁটির জার্মান বিমানবাহিনীর সদস্যদের কাছে। এরপর শুরু হয় অবিশ্বাস্য এক সমন্বিত অভিযান।
জার্মান সামরিক কর্তৃপক্ষ খুঁজে বের করে, ওষুধটি মিউনিখে রয়েছে। পুলিশ সংশ্লিষ্ট ওষুধ কোম্পানির এক কর্মকর্তাকে একটি অনুষ্ঠান থেকে নিয়ে আসে। এরপর বরফে ঢাকা প্রায় ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে পুলিশি ব্যবস্থায় ওষুধটি পৌঁছে দেওয়া হয় মেমিনগেন বিমানঘাঁটিতে।
কিন্তু সেখান থেকে উড়বে কীভাবে? রানওয়ে এতটাই বরফে ঢাকা ছিল যে পুরোটা পরিষ্কার করার সময় ছিল না। শুধু মাঝ বরাবর একটি সরু অংশ বরফমুক্ত করা হয়। ট্যাক্সিওয়ে ব্যবহার করা সম্ভব না হওয়ায় F-104 Starfighter যুদ্ধবিমানটিকে টেনে সরাসরি রানওয়েতে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বেচ্ছায় এই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নেন জার্মান লুফটওয়াফের তরুণ পাইলট লেফটেন্যান্ট ইয়ুর্গেন গুন্ডলিং। তার মিশনের কলসাইন দেওয়া হয় ‘Rescue One’।
রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে ওষুধটি তার ককপিটে তুলে দেওয়া হয়। উড্ডয়নের আগে আরেকটি কূটনৈতিক বাধাও পেরোতে হয়। নিরপেক্ষ অস্ট্রিয়ার আকাশসীমা দিয়ে সামরিক বিমান ওড়ানোর বিশেষ অনুমতি নেওয়া হয়। সম্ভাব্য জরুরি অবতরণের জন্য ইতালির একাধিক সামরিক বিমানঘাঁটিও সারারাত খোলা রাখা হয়েছিল। এরপর Starfighter নিয়ে সার্ডিনিয়ার উদ্দেশে ছুটে যান গুন্ডলিং। কিন্তু ডেসিমোমান্নুতে পৌঁছে অপেক্ষা করছিল নতুন বিপদ।
কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিতে রানওয়ের লাইটিং সিস্টেমের তার পানিতে ডুবে গিয়েছিল। ফলে গভীর রাতে রানওয়ে প্রায় অন্ধকার হয়ে ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সামরিক ও বেসামরিক গাড়ি, বিশেষ করে ট্রাক, রানওয়ের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। তাদের হেডলাইট জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় অস্থায়ী আলোর ব্যবস্থা! একজন রাডার কন্ট্রোলারও বাড়ি থেকে ফিরে এসে গুন্ডলিংকে অবতরণে সহায়তা করেন।
প্রায় রাত ৩টার দিকে অন্ধকার ও বৃষ্টির মধ্যে নিরাপদে অবতরণ করে ‘Rescue One’। সঙ্গে সঙ্গে ইতালীয় কারাবিনিয়েরি ওষুধটি নিয়ে ছুটে যায় কালিয়ারির শিশু হাসপাতালে। জেসিকাকে ওষুধ দেওয়া হয়। সে বেঁচে যায়।
এটা কোনো পরিকল্পিত সামরিক অভিযান ছিল না। এক শিশুর জীবন বাঁচাতে চিকিৎসক, পুলিশ, সামরিক কর্মকর্তা, বিমানঘাঁটির কর্মী, কূটনীতিক, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং একজন স্বেচ্ছাসেবী যুদ্ধবিমান পাইলট, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবাই মিলে অসম্ভব একটি কাজ সম্ভব করেছিলেন।
আর যে F-104 Starfighter মূলত যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেই রাতেই তার সবচেয়ে স্মরণীয় মিশনগুলোর একটি ছিল একটি শিশুর কাছে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া।