ইউক্রেন যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করা কিংবা সম্ভাব্য পরাজয় এড়াতে শেষ ভরসা হিসেবে কৌশলগত স্বল্পপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র বা ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন ব্যবহারের কথা বিবেচনা করতে পারেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্র: এনডিটিভি
কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মূলত স্বল্পপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র। কোনো শহর বা একটি দেশকে পুরোপুরি ধ্বংস করার পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহারের জন্য এসব অস্ত্র তৈরি করা হয়। সাধারণ পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় আকারে ছোট হলেও এসব অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অত্যন্ত বেশি। পাশাপাশি বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তার কারণে বিশাল এলাকা দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত হয়ে পড়তে পারে।
ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি অচলাবস্থায় পৌঁছেছে—রাশিয়ার এমন মূল্যায়নের পরই পুতিনের সামনে এই পারমাণবিক বিকল্পের বিষয়টি নতুন করে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে চীন ও ভারত পুতিনকে যেকোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইউরোপের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে মস্কোর কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হয়েছে। সেখানে ইউক্রেনে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্ফোরণের কথা চিন্তাও না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
আপাতত পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে রাশিয়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ অন্যান্য শহরের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে প্রচলিত শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা করছে।
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। রুশ যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিতে ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখণ্ডের অনেক গভীরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার তেল শোধনাগারের পাশাপাশি বড় বড় ই-কমার্স ও বাণিজ্যিক গুদামকেও সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করছে।
ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে রাশিয়ার ওপর এসব হামলা চালাচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে মস্কো এখন ইউক্রেনীয় হামলাগুলোকে সরাসরি ন্যাটো জোটের হামলা হিসেবে বিবেচনা করছে।
রুশ অর্থনীতির ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে গুরুত্ব না দিয়ে পুতিন সতর্ক করেছেন যে ইউক্রেন কার্যত যুদ্ধের ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোর ওপর রাশিয়ার পাল্টা ও বিধ্বংসী আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
এদিকে মস্কোতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের সফর নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের ধৈর্য ও শক্তি পরীক্ষা না করতে রাশিয়াকে সরাসরি সতর্ক করার উদ্দেশ্যে চলতি সপ্তাহে মস্কো সফর করেছেন সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ।
পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, আগামী বছরগুলোতে ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক অভিযান চালিয়ে জোটটির প্রতিক্রিয়া কেমন হয়, তা পরীক্ষা করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মস্কো শুরুতেই বড় ধরনের কোনো হামলা নাও চালাতে পারে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে একটি বড় ধরনের সাইবার হামলা থেকে শুরু করে সীমান্ত এলাকায় ছোট আকারের স্থল অনুপ্রবেশও থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বুধবার জানিয়েছেন, মস্কো সফরের সময় সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের বৈঠকগুলো মূলত রাশিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গেই হয়েছে, প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে নয়। তবে ওই বৈঠকগুলোতে কী আলোচনা হয়েছে এবং কী বিষয় উঠে এসেছে, তা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। সিআইএ পরিচালকের আকস্মিক সফরের পর রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা চালাতে পারে—এমন প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে পেসকভ এসব দাবিকে পুরোপুরি ‘অনুমান ও গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই ধরনের অনেক ভীতিমূলক মনগড়া গল্প প্রকাশ করা হচ্ছে। অবশ্যই বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।’

