বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদনের সামনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে বিশ্বের মোট শস্য উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদ। সংস্থাটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এবার বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উৎপাদন ৬০ লাখ টন কমতে পারে। তবে উৎপাদন কমলেও মোট উৎপাদনের পরিমাণ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের ২০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের তীব্র তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন কমার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় বিভিন্ন অঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উৎপাদন নিয়ে পূর্বাভাসও টানা দ্বিতীয় মাসের মতো কমানো হয়েছে। এর ফলে শুধু ইউরোপের কৃষি উৎপাদন নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে শস্যের সরবরাহ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্বে গম উৎপাদনের পূর্বাভাস ৪০ লাখ টন কমিয়ে ৮১ কোটি ৭০ লাখ টন করা হয়েছে। একইভাবে ভুট্টার উৎপাদনের পূর্বাভাস ১০ লাখ টন কমিয়ে ১৩০ কোটি ৫০ লাখ টনে নামানো হয়েছে। যব, জোয়ার, বার্লিসহ অন্যান্য শস্যের উৎপাদনও প্রায় ১০ লাখ টন কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন কমার চাপটি শুধু একটি বা দুটি শস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বিশ্বের কৃষিব্যবস্থার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা স্বস্তির জায়গাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের হিসাবে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্বে মোট ২৪১ কোটি ৫০ লাখ টন শস্য উৎপাদিত হতে পারে। আগের বছরের রেকর্ড উৎপাদনের তুলনায় এই পরিমাণ ৩ শতাংশ কম হলেও এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন হতে পারে। ফলে এখনই বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমনটা বলা যাবে না। কিন্তু উৎপাদন কমার পাশাপাশি যদি মজুদ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও কমে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাজারে চাপ বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশ্বের শস্য বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। চলতি বছরে আন্তর্জাতিক শস্য বাণিজ্য ৪৫ কোটি ১০ লাখ টনে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদ। আগের বছরের তুলনায় এটি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে গমের রফতানি। বিশ্বে গম রফতানি ১ কোটি ৩০ লাখ টন কমে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে আছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ। বিশ্ব গমবাজারে দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। কিন্তু সংঘাতের কারণে তাদের গভীর সমুদ্রবন্দরভিত্তিক কৃষিপণ্য রফতানি বারবার বাধার মুখে পড়ছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ওই অঞ্চলে সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে। এরই মধ্যে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গম রফতানি প্রায় ৪০ লাখ টন কমে গেছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানির চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় এই ঘাটতির তাৎক্ষণিক প্রভাব কিছুটা সীমিত রয়েছে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি আরও বদলে যেতে পারে। কারণ শস্যের বাজারে শুধু উৎপাদনই গুরুত্বপূর্ণ নয়, উৎপাদিত পণ্য কোন পথে এবং কতটা নিরাপদে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর, জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যবস্থা কিংবা রফতানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে উৎপাদন ঠিক থাকলেও বাজারে সরবরাহ কমে যেতে পারে। তখন আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এদিকে বিশ্বে শস্যের চাহিদা এবার প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদ। কিন্তু উৎপাদন ও বাণিজ্য কমে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক মজুদের ওপর চাপ পড়তে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বে শস্যের মজুদ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৬০ কোটি ৬০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে। মজুদের এই পতন বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎপাদন কমার সময়ে মজুদও কমে গেলে ভবিষ্যতে কোনো আকস্মিক দুর্যোগ বা সরবরাহ সংকট দেখা দিলে বাজার সামাল দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়।
চালের বাজারেও একই ধরনের চাপের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বে চালের উৎপাদন ৬০ লাখ টন কমে ৪৪ কোটি ১০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে। এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠী খাদ্যের জন্য চালের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন কমার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পরিবর্তন এলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি দেখা দিতে পারে।
তবে সব শস্যের চিত্র একই রকম নয়। সয়াবিনের বাজারে বরং আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে ভালো ফলনের কারণে এবার বিশ্বে সয়াবিনের উৎপাদন ও বাণিজ্য নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। উৎপাদন ৪৪ কোটি ১০ লাখ টন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ১৯ কোটি টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক কৃষিবাজারে একই সময়ে একাধিক ধরনের প্রবণতা কাজ করছে। কোনো অঞ্চলে অতিরিক্ত গরম উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, আবার অন্য অঞ্চলে অনুকূল আবহাওয়া উৎপাদন বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে বাজারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন দামের দিকে। উৎপাদন কমার আশঙ্কা এবং যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক শস্য ও তৈলবীজের মূল্যসূচকও বেড়েছে। জুলাইয়ের তুলনায় এই মূল্যসূচক ৩ শতাংশ বেড়ে দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সূচকটি এখন প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। গম ও সয়াবিনের দামও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ করে বেড়েছে।
এখানে আবহাওয়া ও ভূরাজনীতির প্রভাব একসঙ্গে কাজ করছে। তাপপ্রবাহ সরাসরি কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, আর যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে বাজারে বর্তমান উৎপাদনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকবে, সেই আশঙ্কাও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবার উৎপাদন কমলেও বিশ্বে মোট শস্যের পরিমাণ এখনো ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ পর্যায়ে থাকবে। তাই বর্তমান পূর্বাভাসকে সরাসরি বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে উৎপাদন কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হওয়া, মজুদ হ্রাস এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শস্যের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও উপেক্ষা করা যায় না।
বিশ্ব খাদ্যবাজারের জন্য আগামী সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ভারসাম্য ধরে রাখা। আবহাওয়ার চরমতা যদি আরও বাড়ে এবং যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে উৎপাদনের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তখন বর্তমানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদনের পরিসংখ্যানও বাজারকে পুরোপুরি স্বস্তি দিতে নাও পারে। বরং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত মজুদ, স্থিতিশীল বাণিজ্য এবং উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

