কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সোমবার (৩১ আগস্ট) শুরু হয়েছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। চীন, রাশিয়া ও ভারতের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও উপস্থিত রয়েছেন। ১৯৯৬ সালে সীমান্ত বিরোধ মীমাংসায় ‘সাংহাই ফাইভ’ গঠনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে’।
এই সম্মেলনের বিশেষ তাৎপর্য হলো, এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বের দুই প্রান্তে দুইটি বড় যুদ্ধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের যুদ্ধ এবং ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধগুলো ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। ফরাসি বিনিয়োগ ব্যাংক নাতিসিসের এশিয়া-প্যাসিফিকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেছেন, ‘শি, পুতিন ও মোদিকে একই টেবিলে বসানো সাম্প্রতিক ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা কতটা এগিয়েছে, তার দৃশ্যমান পরীক্ষা হবে’।
সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়ের তালিকা বিস্তৃত। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। ইউরেশীয় পরিবহন ও লজিস্টিক করিডোর, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল রূপান্তর, এই খাতগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং মনে করেন, চলমান যুদ্ধগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি করেছে, এই সম্মেলন চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর জন্য গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, চীন এই সম্মেলনকে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ব্যবহার করলেও বাস্তবসম্মত কোনো প্রস্তাবের বদলে তা মূলত রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমিত থাকার সম্ভাবনা বেশি।
এসসিওভুক্ত ১০টি দেশের পাশাপাশি ১৫টি ‘সংলাপ অংশীদার’ এবং দুটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। এসসিওভুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশ তাদের দখলে।
সম্মেলনের ফাঁকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। মোদি ও পুতিনের মধ্যেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনা এখনও চলমান, তাই শি ও মোদির মধ্যে যে কোনো সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের উপস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কও আলোচনার আওতায় আসতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পুতিন ও পেজেশকিয়ানের বৈঠকে সম্ভবত এই নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার কৌশল এবং সামরিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয় আলোচিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরান—বিশ্বের সবচেয়ে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দুই রাষ্ট্র এই সম্মেলনকে পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যবহার করবে।
এসসিও যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমবিরোধী কোনো একক সামরিক জোট নয়। তবে পুতিন ও শি আগেও এসসিও সম্মেলনগুলোকে পশ্চিমবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। গত বছর চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পুতিন পশ্চিমাদের ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন, আর শি মার্কিন-চীন উত্তেজনা প্রসঙ্গে ‘ভীতিপ্রদর্শনের’ নিন্দা করেছিলেন।
এসসিও কখনোই ন্যাটোর মতো সামরিক জোট বা ইইউর মতো অর্থনৈতিক ইউনিয়ন নয়। এটি মূলত একটি ঐকমত্য-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ব্যবস্থার বাইরে কৌশলগত বিকল্প ও দরকষাকষির পরিসর তৈরি করতে পারে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বিশকেক সম্মেলন থেকে ‘বিশকেক ঘোষণাপত্র’ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে আগামী ২৫ বছরের জন্য এসসিওর অগ্রাধিকার ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হবে।
এখন দেখার বিষয়, শি-পুতিন-মোদি এই তিন নেতা এক মঞ্চে কী বার্তা দেন। যুদ্ধ-বাণিজ্য-নিরাপত্তার এই জটিল সমীকরণে বিশকেক থেকে আসা প্রতিটি বক্তব্য ও ঘোষণাপত্র আগামী দিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

