‘লেক আমেরিকা’ নামকরণ থেকে কানাডার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য সংঘাত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দুটি সিদ্ধান্তই মার্কিন জনগণের বড় অংশের কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। নতুন এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, শুধু সাধারণ আমেরিকান নয়, রিপাবলিকান দলের অনেক সমর্থকও এসব পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
রয়টার্স-ইপসসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে “লেক আমেরিকা” করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন ৬৩ শতাংশ মার্কিনি। বিপরীতে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ সমর্থনের তুলনায় বিরোধিতার ব্যবধান চার গুণের বেশি।
এর আগে ট্রাম্প মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে “গালফ অব আমেরিকা” করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবে এবার অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে বিরোধিতা আরও বেশি দেখা যাচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও এক ধরনের বিভাজন রয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান ভোটারদের ৪৩ শতাংশ হ্রদের নাম পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন, যেখানে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ।
ট্রাম্পের “লেক আমেরিকা” উদ্যোগ মূলত কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য বিরোধের প্রেক্ষাপটে এসেছে। কিন্তু এই বাণিজ্য সংঘাতের পথ নিয়েও মার্কিন জনগণের বড় অংশ সন্তুষ্ট নয়।
নতুন জরিপে দেখা গেছে, কানাডার পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা নতুন শুল্কের বিরোধিতা করছেন ৫৭ শতাংশ আমেরিকান। অন্যদিকে মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ এই নীতির পক্ষে রয়েছেন।
শুধু তাই নয়, নতুন শুল্ক নীতির প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। ৪০ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন, এই শুল্ক তাদের ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিপরীতে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এটি তাদের জন্য লাভজনক হবে।
কানাডার সঙ্গে বর্তমান বিরোধের জন্য কে বেশি দায়ী, সে বিষয়েও জনমত ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। জরিপে ৪৬ শতাংশ মানুষ বলেছেন, এই সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বেশি দায়ী। অন্যদিকে মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ কানাডাকে দায়ী করেছেন।
আলোচনার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের পরিবর্তে সমঝোতার নীতির পক্ষেও রয়েছে ব্যাপক সমর্থন। জরিপে ৬৮ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা, এমনকি এতে সব দাবি পূরণ না হলেও। মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষ কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কানাডা নীতি ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কানাডা সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে এই ইস্যু ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আলাস্কা, মেইন, মিশিগান ও ওহাইওর মতো রাজ্যগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন রয়েছে। এসব অঞ্চলের ভোটাররা যদি বাণিজ্যনীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হন, তাহলে তা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো আবারও দেখাচ্ছে যে তিনি এমন কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেগুলো সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগের সঙ্গে সবসময় মেলে না। অনেক মার্কিন নাগরিক যেখানে দ্রব্যমূল্য কমানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন নাম পরিবর্তন ও বাণিজ্য সংঘাতের মতো ইস্যু সামনে আনছে।
সব মিলিয়ে জরিপের ফলাফল একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, কানাডার সঙ্গে সংঘাত কিংবা “লেক আমেরিকা” নামকরণের মতো উদ্যোগের জন্য মার্কিন জনগণের মধ্যে বড় ধরনের আগ্রহ নেই। এমনকি ট্রাম্পের নিজ দলের মধ্যেও এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে পূর্ণ সমর্থন তৈরি হয়নি।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই জনমত ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত হয়ে উঠতে পারে।

