নেপালের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্যোগে প্রাণহানির মিছিল যেন থামছেই না। নেপাল-চীন সীমান্তের আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫৫ জনে। এর মধ্যে নেপালে ৯৩৯ জন এবং চীনের তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪ হাজার ৪৭১ জন। এরই মধ্যে নুয়াকোট জেলার বেত্রাবতী এলাকায় একটি বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২৪টি মরদেহ। বন্যার পানিতে বাড়িটি ভেসে যাওয়ার পর সেখানে লাশগুলো আটকা পড়েছিল বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথর ধসের পর ভয়াবহ হড়পা বান নামে। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায় ঘরবাড়ি, গাড়ি, রাস্তা ও সেতু। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, একা নুয়াকোট জেলাতেই ১ হাজার ৫৫৮ জন এবং রসুয়ায় ৮৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিকও নিখোঁজ তালিকায় আছেন।
নুয়াকোটের বেত্রাবতী পৌরসভা-১০ এলাকায় একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা ২৪টি মরদেহের মধ্যে ১৩ জন নারী ও ১১ জন পুরুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে একটি শিশুর মরদেহও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই বাড়িতে ‘উত্তরগয়া মিনি মার্ট’ ছিল। উদ্ধার হওয়া ২৪ মরদেহের মধ্যে ছয়টি হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপার বিপিন রেগমি জানিয়েছেন, ওই স্থানে আরও মরদেহ মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অন্তত ৯০০ শ্রমিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় ৫০০ জন টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন। রসুয়া ও নুয়াকোটের একাধিক প্রকল্পের সুড়ঙ্গে এখনও কর্মীরা আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। পুরু কাদা ও জল জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এ দিকে ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রায় ৪০-৪২ জন ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছিলেন। বন্যার পর ষষ্ঠ দিনেও সেখানে উদ্ধারকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ধার অভিযানে নেপালি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে ঘন কাদা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১১টি প্রকল্পের ৯৩৩ শ্রমিক নিখোঁজ বা আটকা পড়েছেন।
নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর ওপর নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোয় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় অন্তত ১১টি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের অনুমান, প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ জরুরি ভিত্তিতে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা প্রয়োজন।
গণকবরেও পড়েছে শত শত মরদেহ। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে নিখোঁজ পরিজনদের খোঁজ করছেন। নুয়াকোটের ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ২৪টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি। নেপালের ইতিহাসে এত বড় প্রাণহানি আর কোনো দুর্যোগে ঘটেনি। এই ভয়াবহ বন্যা এখন দেশটির জন্য এক চরম মানবিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

