ইরানকে শব্দের চেয়েও দ্রুতগতির ‘সুপারসনিক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইনান্সিয়াল টাইমসের (Financial Times) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সূত্র: ফাইনান্সিয়াল টাইমস
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় র্যামজেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি উন্নয়নে রুশ প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেছেন। র্যামজেট প্রযুক্তি সফলভাবে তৈরি ও ক্ষেপণাস্ত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে ইরান এমন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে, যা কয়েক গুণ শব্দের গতিতে উড়তে সক্ষম হবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরীগুলো নতুন ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, রাশিয়ার গোপন নথিপত্র, ফাঁস হওয়া যোগাযোগ, প্রকৌশলীদের সফরের রেকর্ড এবং সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তি আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা।
‘C430L’ নামের এই গোপন প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয়। ২০২৬ সাল পর্যন্তও এর কার্যক্রম চলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পরও প্রকল্পটির সহযোগিতা অব্যাহত ছিল।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের জন্য র্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা উন্নয়নে সহায়তা করা। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে কয়েক গুণ শব্দের গতিতে উড়তে পারে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি মূলত জাহাজবিধ্বংসী ও স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে রাশিয়ার অভিজ্ঞ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা যুক্ত ছিলেন। রুশ রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রকল্পটির সমন্বয় করেছে এবং রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ত্রোয়েনিয়া এতে যুক্ত ছিল। রুশ প্রকৌশলীরা ইরানে গিয়ে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের র্যামজেট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অত্যন্ত সংবেদনশীল কৌশলগত সামরিক প্রযুক্তি ইরানের হাতে তুলে দিতে রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রয়োজন হওয়ার কথা। তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র সংস্থা কিংবা সরকার এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। ফাইনান্সিয়াল টাইমসের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও ইরানের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ইরান ইতোমধ্যে র্যামজেট ইঞ্জিন তৈরি করে এর উড্ডয়ন পরীক্ষাও চালিয়েছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো কার্যকরভাবে সামরিক বাহিনীতে মোতায়েন হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এর আগে ইরান রাশিয়াকে ড্রোন প্রযুক্তি ও ড্রোন সরবরাহ করেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। এবার রাশিয়ার কাছ থেকে ইরানের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন মাত্রা হিসেবে সামনে এসেছে।

