নেপালে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের নয় দিন পর একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আরও কয়েকজনের গলার শব্দ শুনতে পেয়েছেন উদ্ধারকারীরা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা অন্য শ্রমিকদেরও জীবিত উদ্ধারের নতুন আশা তৈরি হয়েছে।
নেপালের রসুয়া ও নুয়াকোটসহ হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় প্রবল বন্যা ও ভূমিধসে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব প্রকল্পে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েন। এর মধ্যে ‘ত্রিশূলী ৩এ’ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে নিখোঁজ ৪২ শ্রমিককে উদ্ধারে গত কয়েক দিন ধরে টানা অভিযান চালাচ্ছিলেন উদ্ধারকারীরা।
প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই সুড়ঙ্গ খনন করে এগোতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে সেখান থেকে দুজনকে জীবিত বের করে আনা সম্ভব হয়। উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটির তৈরি ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে প্রায় এক ডজন উদ্ধারকারী একজনকে টেনে বাইরে নিয়ে আসছেন। তাকে বের করে আনার পর উদ্ধারকারীরা করতালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
নুয়াকোট জেলার পুলিশ প্রধান বিপিন রেজমি বলেন, উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের গলার শব্দ শুনেছেন। ঘটনাস্থলে একটি চিকিৎসা দলও পাঠানো হচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছানোর প্রধান সুড়ঙ্গটি চার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ, অর্থাৎ প্রায় ২ দশমিক ৫ মাইল।
নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের আশা দিন যত গড়াচ্ছিল, ততই ক্ষীণ হয়ে আসছিল। আটকে পড়াদের মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের নাগরিকও রয়েছেন।
ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নদী ও আশপাশের বিশাল এলাকা সিমেন্টের মতো ঘন কাদায় ঢেকে যায়। এই দুর্যোগে নেপালে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নয় দিন পর দুজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা উদ্ধার অভিযানে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল পরীক্ষিত মেহরা বলেন, এ ধরনের উদ্ধার অভিযানে প্রথম ৪৮ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, খোলা জায়গার তুলনায় কোনো বন্ধ স্থানে আটকে পড়লে মানুষ অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকা মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সেখানে চারপাশে কিছু দেখা যায় না, ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের অবস্থান ও দিক সম্পর্কে ধারণা হারাতে শুরু করে।
মেহরার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোহীন পরিবেশে সাধারণত ২৪ থেকে ২৫ ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষ দিশা হারিয়ে ফেলতে পারেন। ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পর হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা ও শোনার অভিজ্ঞতা হতে পারে, যা বাস্তবে সেখানে নেই।
এরপর পরিস্থিতি ক্রমেই পরিণত হয় জীবন বাঁচিয়ে রাখার কঠিন লড়াইয়ে।
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অসম্ভব কিছু ঘটতে পারে বলে মনে করেন মেহরা। তার ভাষায়, ‘এর মধ্যেও অলৌকিক ঘটনা ঘটে।’
নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে দুজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা যেন সেই কথাকেই নতুন করে সত্যি করে তুলেছে। এখন উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—ভেতরে থাকা অন্য শ্রমিকদেরও জীবিত অবস্থায় বের করে আনা।

