যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন করে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক অবস্থানের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই সংঘাতের শেষ কোথায়? যুদ্ধ কি আরও দীর্ঘ হবে, নাকি কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সমাধান শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না। বরং চীনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনকে বাদ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সপ্তাহে এমন একটি কর্মসূচি চালু করেন, যার লক্ষ্য ছিল ইরানকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তবে এই কঠোর পদক্ষেপ সংঘাত কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল মূলত ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ধারণা ছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ইরান আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে একটি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করা সহজ নয়।
কারণ ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তাহলে বর্তমান ইরানি নেতৃত্বের টিকে থাকার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ইতিহাসে সাধারণত যুদ্ধ শেষ হয় কয়েকটি কারণে। কোনো পক্ষ সম্পূর্ণভাবে পরাজয় স্বীকার করলে, দুই পক্ষের নেতৃত্ব ক্ষয়ক্ষতিতে ক্লান্ত হয়ে সমঝোতায় এলে, অথবা কোনো শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা নিলে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
কিন্তু বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতিতে এসব সম্ভাবনাই জটিল হয়ে আছে। ইরান আত্মসমর্পণের অবস্থানে নেই, আবার যুক্তরাষ্ট্রও পূর্ণমাত্রার স্থল অভিযান চালানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না। অন্যদিকে, যে দেশটি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে—সেই চীন এখন পর্যন্ত সরাসরি হস্তক্ষেপের পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
ফলে সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরান সংকটে চীনের ভূমিকা সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। কারণ চীন শুধু ইরানের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তিও।
যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের ওপর ইরান সম্পর্কিত চাপ প্রয়োগ করতে চায়, তবে সেটি সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কারণ আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে চীনের বড় প্রভাব রয়েছে। এসব খনিজের ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন প্রযুক্তি খাত পরিচালিত হয়।
অর্থাৎ, ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুন মাসে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। এর পরপরই একটি সমঝোতা স্মারকও তৈরি হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ বাস্তবে স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেয়নি।
ইরান এখনও হরমুজ প্রণালীর চলাচলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত অধিকাংশ জাহাজের ওপর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে কাগজে থাকা সমঝোতা বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
এটি দেখায় যে শুধু আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়, বরং উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতাই প্রয়োজন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। তখন অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, চীন দ্রুত সংঘাত বন্ধে উদ্যোগ নেবে। কারণ এর আগে চীনের তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ এই পথ দিয়ে আসত।
তবে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক প্রমাণিত হয়নি। সংঘাত শুরু হওয়ার সময় চীনের কাছে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেলের মজুত ছিল, যা স্বাভাবিক মজুতের তুলনায় ২০০ মিলিয়ন ব্যারেল বেশি। বর্তমানে দেশটির কাছে এখনও ১ দশমিক ১৫ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে।
এর ফলে চীন তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকটে পড়েনি এবং সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনও অনুভব করেনি।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের ওপর আগের তুলনায় কম নির্ভর করার চেষ্টা করছে।
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মাত্রার জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও এই পরিবর্তন ব্যয়বহুল, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর বাজার প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো বুঝতে শুরু করেছে যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। এসব দেশ এখন আঞ্চলিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে স্থায়ী সমাধান হতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়বে এবং একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও বাস্তবসম্মত সমাধান খোঁজা হবে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনকে সম্পৃক্ত করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে। এতে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়াশিংটন সফরের কথা রয়েছে। এই সফর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে চীন শেষ পর্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা নেবে, নাকি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই যাবে—তা এখনও অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুধু দুই দেশের বিরোধ নয়; এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
শুধু নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক চাপ দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বাস্তবসম্মত সমঝোতা।
এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পথ বেছে নিতে পারবে? কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করছে।

