ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ১০ দিন পর নেপালে আরও দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় বন্যার তাণ্ডবে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে এক চীনা নাগরিক এবং চারতলা একটি ভবনের ওপরের তলা থেকে ৬০ বছর বয়সী এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা।
এর আগে শুক্রবার নেপালের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষ থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। ফলে গত ৪৮ ঘণ্টায় ভয়াবহ বন্যার পর জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে মোট তিনজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এখনও শত শত টানেলকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। উপত্যকা ভেসে যায়, মাটির নিচে চাপা পড়ে পুরো গ্রাম। বন্যার নয় দিন পর উদ্ধারকর্মীরা যখন জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়ে মরদেহ উদ্ধারে মনোযোগ দিচ্ছিলেন, তখনই ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন আশার আলো দেখা দেয়।
শুক্রবার সকালে উদ্ধারকারীরা ভূগর্ভ থেকে একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এরপর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একটি ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে সঞ্জয় সাহ ও কবির মহার্জন নামের দুই শ্রমিককে জীবিত বের করে আনা হয়। উদ্ধারকারীদের একজনের পিঠে করে বেরিয়ে আসা সঞ্জয় সাহ হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। পরে নেপাল সেনাবাহিনীর এক উদ্ধারকারীর হেলমেটের ওপর মাথা রেখে তিনি প্রথম যে প্রশ্নটি করেন, তা ছিল—‘আজ কত তারিখ?’
অন্য শ্রমিক কবির মহার্জনকে স্ট্রেচারে করে বের করে আনা হয়। তাঁর মুখে তখন অক্সিজেন মাস্ক ছিল।
এই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল প্রায় কোনো সূত্র ছাড়াই। ২৬ আগস্টের বন্যার পর ত্রিশূলী-৩এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেহারা পুরোপুরি বদলে যায়। কোথা থেকে খনন শুরু করতে হবে, তা নিয়েও শুরুতে উদ্ধারকারীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
ভূতত্ত্ববিদ আর্নল্ড ডিক্স, যিনি ঘটনাস্থলে নেপালি উদ্ধারকারীদের পরামর্শ দিচ্ছেন, জানান, টানেলের অবস্থান শনাক্ত করতে উদ্ধারকারী দলকে স্যাটেলাইট তথ্য, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ-সংক্রান্ত নকশা এবং ভূ-প্রকৃতির তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন একটি টানেলের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়, যেটি পুরোপুরি ধসে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম ছিল। ডিক্স ওই এলাকাকে ‘গোল্ডিলক্স জোন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
নুওয়াকোট জেলার পুলিশ প্রধান বিপিন রেগমি জানান, জটিল অনুসন্ধান ও মাটি সরানোর কাজ চলার সময় উদ্ধারকারীরা আগেই মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই টানেলের ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালানো হয়।
এদিকে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন টানেলে উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। নেপাল পুলিশের, সেনাবাহিনীর ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার যৌথ দল ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। জরুরি আলোর সাহায্যে টানেলগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির উপব্যবস্থাপক সুরেশ রাউত জানিয়েছেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান আরও কয়েক দিন চলবে। কারণ এখনও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কেউ জীবিত থাকতে পারেন বলে আশা করছেন উদ্ধারকারীরা।
বন্যায় মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। নেপালি ও চীনা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে CNN-এর হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে একের পর এক জীবিত উদ্ধারের ঘটনা উদ্ধারকারীদের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। মাত্র একদিন আগেই স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে কাদামাটির নিচে চাপা পড়া আরেকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল শনাক্ত করে সেখান থেকে দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল। এখন নতুন করে আরও দুজনের উদ্ধারে ১০ দিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।

