ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, সুদের হার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ—সবখানেই এর প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে রয়েছে, বন্ধকি ঋণের সুদ প্রায় ৭ শতাংশের দিকে উঠেছে এবং ডিজেলের রেকর্ড দামের কারণে বিভিন্ন কোম্পানি পরিবহন খরচ সামলাতে অতিরিক্ত সারচার্জ বসাচ্ছে।
যুদ্ধ শেষ হলে এসব বাড়তি ব্যয়ের কিছুটা কমে আসতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যে ঘটেছে, যেগুলো যুদ্ধ শেষ হলেও সহজে আগের অবস্থায় ফিরবে না। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, চীনের তেলনির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের যেকোনো দেশের জাহাজ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে অবাধে মধ্যপ্রাচ্যের পণ্য পরিবহন করতে পারত। প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই সরু জলপথ দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।
ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করে এবং পারস্য উপসাগরে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। এতে কার্যত প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়। মে মাসে ইরান কৌশল পরিবর্তন করে। পুরো জলপথ বন্ধ করার বদলে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে আনতে ‘পারস্য উপসাগর স্ট্রেইট অথরিটি’ গঠন করে। এরপর ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিবন্ধন, নির্ধারিত পথে চলাচল এবং টোল দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়।
জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ইরান ৬০ দিনের জন্য টোল নেওয়া বন্ধ রাখে। তবে কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন না করা জাহাজের ওপর হামলা চালানোর ঘটনা বন্ধ হয়নি। পরে সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে রাতের বেলায় ‘ডার্ক’ ট্রানজিট পরিচালনা ও জাহাজে সামরিক পাহারা দেওয়া শুরু করে। এর ফলে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হলেও এই ব্যয়বহুল ও জটিল সামরিক ব্যবস্থাই প্রমাণ করছে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব কতটা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরানের অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এমনকি ভবিষ্যতে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে কোনো ধরনের টোল দেওয়ার ব্যবস্থাও হতে পারে বলে মনে করছেন তেলবাজার বিশ্লেষকেরা।
এ ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক জলপথে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে জেপিমরগ্যানের পণ্যবাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভার মতে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রণালিতে নেভিগেশন নিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা পাহারা, জরুরি সহায়তা ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সেবা ফি নেওয়ার নজির আগে থেকেই রয়েছে। তুরস্ক, ডেনমার্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ এমন ফি নিয়ে থাকে। ইরানও একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করলে প্রতি ব্যারেল তেলের দামে প্রায় ১ ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ যোগ হতে পারে।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, তেল উৎপাদন না করেও চীন বৈশ্বিক তেলবাজারে কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই মজুত ব্যবহার করে দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের চাহিদার ওপর বড় প্রভাব পড়ে।
তবে চীনের তেল চাহিদার কিছু পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। মে দিবসের পাঁচ দিনের ছুটিতে দেশটির মহাসড়কগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। ওই ছুটিতে মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়ির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা এক বছর আগের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চীন দ্রুত তেল ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে কয়লাভিত্তিক উৎপাদনে যেতে পেরেছে। ফলে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকটের মধ্যেও দেশটি তার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কমেছে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা। জেপিমরগ্যানের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ১৯০ কোটি ব্যারেল তেল বাজার থেকে হারিয়ে গেলেও মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কম তেল ব্যবহার করে এর প্রায় ৮০ কোটি ব্যারেলের ঘাটতি সামলে নেয়।
এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় তেলের ব্যবহারে বেশি নমনীয় হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের কতটা সাময়িক আর কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চীনসহ বড় অর্থনীতিগুলো যদি তেলের ব্যবহার স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা আর আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ফিরবে না—এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ব হয়তো ‘পিক অয়েল’ বা সর্বোচ্চ তেল চাহিদার পর্যায় পার করে ফেলেছে।
যুদ্ধের আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল উৎপাদনে। তেলের সরবরাহ সংকট সামাল দিতে ব্রাজিল, গায়ানা, কানাডা, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ উৎপাদন বাড়িয়েছে। জেপিমরগ্যানের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিলের দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল বেড়েছে। গায়ানায় বেড়েছে ৩ লাখ ব্যারেল, কানাডায় ২ লাখ এবং নরওয়েতে ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
যুক্তরাষ্ট্রও উৎপাদন বাড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটি এখন প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ব্যারেল বেশি তেল উৎপাদন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি উৎপাদনের বড় অংশ বেসরকারি মালিকানাধীন তেলক্ষেত্র থেকে আসছে। এর একটি অংশ পরিশোধনাগারে গিয়ে জেট ফুয়েল তৈরি করছে, আর প্রাকৃতিক গ্যাস যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে, যেখানে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।
ব্রাজিলের উৎপাদন বৃদ্ধিও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির নতুন তেল প্রকল্পগুলো সফলভাবে এগোতে থাকলে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। একইভাবে গায়ানায় নতুন অফশোর উৎপাদন জাহাজ যুক্ত হওয়ায় দেশটির বিশাল তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদনের গতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারীরাও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরব তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে বিশাল ট্রাক বহর ব্যবহার করছে এবং প্রণালিটি এড়িয়ে রেড সাগরে পণ্য পাঠাতে দেশটির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। ইরাকও ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণের জন্য শেভরনের সঙ্গে আলোচনা করছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যে ওপেকের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জোটটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত এপ্রিলে ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সংগঠনটির টিকে থাকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরাকও ভবিষ্যতে ওপেকে থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেশটির তেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ইরাককে জোটে থাকা-না থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের অনুমতি চায় এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ৭০ লাখ ব্যারেলে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অন্য দেশগুলোও উৎপাদন বাড়াতে চাইলে সৌদি আরবকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে, যেখানে বিশ্ববাজারের চাহিদার চেয়েও বেশি তেল উৎপাদনের সুযোগ দিতে হবে।
এর ফলে সাধারণ ভোক্তারা স্বস্তি পেতে পারেন, কারণ অতিরিক্ত সরবরাহে তেলের দাম কমে যেতে পারে। কিন্তু বিপরীত দিকে, বিশ্ববাজারে দীর্ঘস্থায়ী তেল উদ্বৃত্ত তৈরি হলে তেল কোম্পানি ও উৎপাদনকারী দেশগুলোর মুনাফা ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে। ফলে ইরান যুদ্ধ শুধু বর্তমান তেলের দাম বা সরবরাহ ব্যবস্থাকেই বদলায়নি; এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ভারসাম্যও নতুনভাবে নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

