ইসরায়েলকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে গাজায় সংঘটিত গণহত্যায় সহায়তা এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে জার্মানির বিরুদ্ধে নিকারাগুয়ার করা মামলা করেছে। এখন মামলার মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক আদালত কি একটি রাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের বৈধতা ও তার সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক দায় নির্ধারণ করতে পারবে?
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছে। তবে এখনো আদালত মামলার মূল অভিযোগ—জার্মানি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না—সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর্যায়ে যায়নি।
জার্মানি আদালতের কাছে মামলাটি খারিজের আবেদন করেছে। দেশটির প্রধান আইনজীবী জুলিয়া মোনার যুক্তি দিয়েছেন, নিকারাগুয়া মামলা করার আগে জার্মানিকে তার অভিযোগের জবাব দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ দেয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো ‘বিরোধ’ তৈরি হয়নি, যার ভিত্তিতে আইসিজে এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে।
জার্মানির দ্বিতীয় আপত্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বার্লিনের দাবি, নিকারাগুয়ার উত্থাপিত কিছু অভিযোগ এমন সময়ের ঘটনা নিয়ে, যখন জার্মানি আইসিজের বাধ্যতামূলক এখতিয়ার মেনে নেয়নি। ফলে এসব বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার থাকা উচিত নয়। তৃতীয়ত, জার্মানি সতর্ক করেছে—নিকারাগুয়ার মামলাটি গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে কোনো তৃতীয় রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বৈধতা নিয়েও আইসিজের সামনে মামলা করার একটি নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি হতে পারে।
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে গণহত্যা সনদের ‘প্রতিরোধের দায়িত্ব’
নিকারাগুয়ার ২০২৪ সালে করা মামলার আইনি ভিত্তি শুধু অস্ত্র বিক্রির বৈধতা নিয়ে নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি সনদ।
নিকারাগুয়ার যুক্তি হলো — কোনো রাষ্ট্র নিজে গণহত্যা না করলেও, যদি সে জেনেশুনে এমন সহায়তা (যেমন অস্ত্র সরবরাহ) অব্যাহত রাখে যা গণহত্যা সংঘটনে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনি দায় তৈরি হয়।
অর্থাৎ মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘গণহত্যা না করা’ এবং ‘গণহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া’ কি একই বিষয়?
আন্তর্জাতিক আইনে এর উত্তর সরল নয়। গণহত্যা সনদের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রগুলোকে গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে। ফলে কোনো রাষ্ট্র যদি গণহত্যার বাস্তব ও গুরুতর ঝুঁকি সম্পর্কে জানে বা জানার কথা থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের ওপর ঝুঁকি কমাতে তার সক্ষমতার মধ্যে থাকা পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব তৈরি হতে পারে।
এখানেই নিকারাগুয়ার মামলার সম্ভাব্য আইনি গুরুত্ব। কারণ প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াচ্ছে অন্য রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া কখন এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যখন সেটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বেআইনি সহায়তা বা গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
অস্ত্র সরবরাহ করলেই কি রাষ্ট্র দায়ী হবে?
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে।
কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে—এটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধে দায় প্রমাণ করে না। আদালতকে দেখতে হবে অস্ত্র সরবরাহের সময় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র কী জানত, কী ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল, সেগুলো কীভাবে ব্যবহারের সম্ভাবনা ছিল এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে ওই রাষ্ট্রের ওপর কী ধরনের আন্তর্জাতিক আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল।
অর্থাৎ সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে শুধু ‘অস্ত্র দেওয়া হয়েছে কি না’ যথেষ্ট নাও হতে পারে; ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান, অস্ত্রের প্রকৃতি, ব্যবহারের সম্ভাব্য ক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রের সক্ষমতা—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিকারাগুয়া বলছে, গাজায় পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সতর্কতা থাকার পরও জার্মানির সামরিক সহায়তা অব্যাহত ছিল। দেশটির অভিযোগ, এর মাধ্যমে জার্মানি শুধু গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়নি, বরং কথিত গণহত্যা সংঘটনে অবদানও রেখেছে।
অন্যদিকে জার্মানি বলছে, তারা সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি কঠোরভাবে পর্যালোচনা করে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নেয়। সাম্প্রতিক শুনানিতে জার্মানির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর থেকে গাজা সংঘাতে ব্যবহার করা যেতে পারে—এমন ‘যুদ্ধাস্ত্র’ ইসরায়েলে পাঠানোর অনুমোদন তারা দেয়নি।
আইসিজের আগের আদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই মামলায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের এপ্রিলে নিকারাগুয়া জরুরি ভিত্তিতে জার্মানির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা চেয়েছিল, যাতে অস্ত্র সরবরাহসহ কিছু কর্মকাণ্ড বন্ধে আদালত নির্দেশ দেয়।
আইসিজে সেই সময় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা দেয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে আদালত মামলাটি সরিয়ে দেওয়ার জার্মানির আবেদনও গ্রহণ করেনি। আদালত বলেছিল, সে পর্যায়ে জার্মানির বিরুদ্ধে মামলাটি শুনতে তার এখতিয়ার একেবারেই নেই—এমনটা স্পষ্ট নয়। একই আদেশে আদালত অস্ত্র হস্তান্তরকারী রাষ্ট্রগুলোর আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও গণহত্যা সনদের অধীনে দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে—এই আদেশে আইসিজে জার্মানিকে দায়ী বলে ধরে নিয়েছে বলে মনে হয় না। বরং আদালত স্পষ্ট করেছিল, ওই পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মামলার এখতিয়ার, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা মূল অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এবার লড়াই মূলত ‘এখতিয়ার’ নিয়ে
২০২৫ সালের অক্টোবরে জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার এখতিয়ার ও নিকারাগুয়ার কিছু দাবির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রাথমিক আপত্তি তোলে। এর ফলে মূল মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে এখন প্রাথমিক আপত্তির শুনানি হচ্ছে।
জার্মানি মূলত তিনটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—দুই দেশের মধ্যে আইসিজের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার মতো প্রকৃত ‘বিরোধ’ ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো আদালতের এখতিয়ারের সময়সীমার মধ্যে পড়ে কি না এবং তৃতীয় রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বৈধতা পরোক্ষভাবে নির্ধারণের মতো কোনো এখতিয়ার আদালতের রয়েছে কি না।
এই আপত্তি সফল হলে আদালত মূল অভিযোগে যাবে না। আর আপত্তি খারিজ হলে মামলাটি পরবর্তী ধাপে গিয়ে জার্মানির আচরণ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে কি না—সেই প্রশ্নের বিচার হতে পারে।
মামলাটির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার স্পষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাতিসংঘের অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি (Arms Trade Treaty, ATT)-এর মতো কাঠামো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি মূল্যায়নের কথা বললেও, গণহত্যা সনদের অধীনে “প্রতিরোধের দায়িত্ব” আর অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ক নিয়ে আইসিজের কোনো সুস্পষ্ট, চূড়ান্ত রায় এখনো নেই।
এই মামলায় আদালত যদি মূল অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছায় তাইলেঃ
- ভবিষ্যতে অস্ত্র রপ্তানিকারী রাষ্ট্রগুলোকে আরও কঠোর ঝুঁকি-মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুসরণে বাধ্য করতে পারে
- সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক আইনি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে
- “মিত্র রাষ্ট্রকে সহায়তা” ও “আন্তর্জাতিক অপরাধে সহযোগিতা”র মধ্যে একটি আইনি সীমারেখা টেনে দিতে পারে
জার্মানির জন্য আইনি ও রাজনৈতিক দ্বৈত সংকট
জার্মানির অবস্থান এখানে দ্বিস্তরীয়। একদিকে দেশটি ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি তার ঐতিহাসিক দায়ের কথা বলছে। অন্যদিকে একই রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং গণহত্যা প্রতিরোধের বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও সামঞ্জস্য রাখতে হচ্ছে।
জার্মানির আইনজীবী আদালতে বলেছেন, ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি জার্মানির সমর্থন দেশটির ঐতিহাসিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি জার্মানির সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেছেন।
অর্থাৎ মামলাটি শেষ পর্যন্ত শুধু এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না যে জার্মানি অস্ত্র দিয়েছে কি না। বরং প্রশ্ন উঠতে পারে—আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা এবং একটি রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে সংঘাত হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে?
এখন কী হতে পারে
আইসিজেতে চলমান শুনানি ৭ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে। প্রথমে জার্মানি তার প্রাথমিক আপত্তি উপস্থাপন করছে, এরপর নিকারাগুয়া জবাব দেবে এবং উভয় পক্ষ আবার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবে।
এরপর আদালত প্রথমে এখতিয়ার ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে মামলাটি মূল পর্যায়ে যাবে কি না।
সুতরাং এই মুহূর্তে বলা যাবে না যে জার্মানি গণহত্যায় সহায়তা করেছে—আবার এটিও বলা যাবে না যে অভিযোগটি আইনি ভিত্তিহীন। আইসিজের সামনে এখনো মূলত প্রশ্ন হচ্ছে, এই অভিযোগ বিচার করার দরজা আদালতের জন্য খোলা আছে কি না।
আর যদি সেই দরজা খোলে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের সামনে আরও কঠিন প্রশ্ন অপেক্ষা করছে—একটি রাষ্ট্র যখন অন্য রাষ্ট্রকে অস্ত্র দেয়, সেই অস্ত্র কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহৃত হবে তা সম্পর্কে তার জ্ঞান ও সম্ভাব্য ঝুঁকি কখন তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধের দায়ের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
সেই উত্তর শুধু জার্মানির জন্য নয়; ভবিষ্যতে যেকোনো সংঘাতে অস্ত্র সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনগত নজির তৈরি করতে পারে।

