যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার জন্য এটি একটি উদ্বেগজনক রেকর্ড। দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি এবং সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ায় ঋণের বোঝাও দ্রুত বাড়ছে।
পিটার জি. পিটারসন ফাউন্ডেশনের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রতিদিন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার করে বাড়ছে। কিন্তু ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার আসলে কত বড় অঙ্ক, তা কল্পনা করা কঠিন।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলার মানে ১ বিলিয়ন ডলারের ৪০ হাজার গুণ। আবার ১ মিলিয়ন ডলারের ৪ কোটি গুণ। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলার করে ঋণ পরিশোধ করলেও পুরো ঋণ শোধ করতে প্রায় ১১০ বছর লাগবে। প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ডলার করে পরিশোধ করলে সময় লাগবে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বছর।
যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি ৩০ লাখ। সেই হিসাবে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণকে নাগরিকদের মধ্যে ভাগ করলে প্রত্যেক আমেরিকানের ওপর প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ডলার করে ঋণের বোঝা পড়ে।
মাত্র ১০ বছরেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৬ সালের আগস্টে দেশটির মোট জাতীয় ঋণ ছিল ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের সামান্য কম। এক দশকের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে।
কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, এই মাত্রার ঋণগ্রহণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিপজ্জনক ঋণচক্রের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনী ব্যক্তির সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ তাদের মোট সম্পদের প্রায় ১৫ গুণ। শুধু শীর্ষ ১০ নয়, ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের শীর্ষ ৫০০ ধনীর মোট সম্পদ যোগ করলেও তা প্রায় ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের হিসাবে, ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৭০০ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ডলার ধরলে, পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত উত্তোলিত সব সোনার মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ইতিহাসের সব সোনা বিক্রি করেও যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণ পুরোপুরি শোধ করা যাবে না।
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি এনভিডিয়ার বাজারমূল্য ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের সমান অর্থমূল্যে পৌঁছাতে ৭টিরও বেশি এনভিডিয়ার প্রয়োজন হবে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের সবচেয়ে মূল্যবান ১১টি কোম্পানির সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের চেয়ে প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলার কম।
ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হিসাবে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণে আনুমানিক ১১৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। সেই হিসাবে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে প্রায় ৩৪০টি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ঋণের পরিমাণ এখন দেশটির পুরো এক বছরের অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়েও বেশি। ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি ছিল ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ দেশের জাতীয় ঋণ জিডিপির চেয়েও বড়।
ঋণ-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ১২৩ শতাংশ, যা প্রায় রেকর্ড পর্যায়ের। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো এই অনুপাত ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ-জিডিপি অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের পাঁচ বৃহৎ অর্থনীতি—চীন, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ভারত—এই পাঁচ দেশের সম্মিলিত জিডিপির মূল্য প্রায় ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এই পাঁচ দেশের পুরো অর্থনীতির সম্মিলিত আকারের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি।
নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর মোট ঋণ—যার মধ্যে বাড়ির ঋণ, গাড়ির ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের ঋণ ও শিক্ষাঋণ রয়েছে—ছিল প্রায় ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারের জাতীয় ঋণ পারিবারিক মোট ঋণের দ্বিগুণেরও বেশি।
এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের মোট বকেয়া ঋণ ছিল ১ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ দেশটির সব ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া ঋণের প্রায় ৩২ গুণ।
যুক্তরাষ্ট্রে অবসরকালীন সম্পদের মোট মূল্য চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৪৭ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ঋণ এই অবসরকালীন সম্পদের প্রায় ৮৫ শতাংশের সমান।

