দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য তার শ্রমবাজারের দরজা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন ওয়ার্ক পারমিট প্রদান, শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা অনুমোদন এবং নতুন শ্রম প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে দেশটি, যা গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই সময়ে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ শ্রম ভিসা অনুমোদন প্রক্রিয়াও বন্ধ থাকছে।
লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ৯ সেপ্টেম্বর এই সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে, যার তথ্য প্রথম প্রকাশ করে দেশটির একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ, মানবপাচার রোধ এবং অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রমিক সরবরাহ বন্ধ করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া যে সব নিয়োগকর্তা শ্রমিক নিয়ে আসার পর নিজেদের দায়িত্ব থেকে সরে যান, তাদের নিয়ন্ত্রণেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশী নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হলো, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নির্দেশনায় দেওয়া হয়নি।
নতুন নিয়মের আওতায় কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগকর্তা বা শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এখন থেকে নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশী নাগরিকদের লাওসে প্রবেশ করানো বা কর্মে নিয়োগ দেওয়ার অনুমোদন দিতে পারবে না। তবে পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী চলমান বড় ধরনের সরকারি অনুমোদিত অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো এই স্থগিতাদেশের বাইরে থাকবে।
নির্দেশনা অমান্য করলে বেশ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক জরিমানা, বাধ্যতামূলক দেশ থেকে বহিষ্কার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা। অনুমোদন না নিয়ে শ্রমিক আমদানি বা নিয়োগ দিলে প্রতিটি ঘটনার জন্য প্রায় ১১০ ডলারের সমপরিমাণ জরিমানা গুনতে হবে নিয়োগকর্তাকে। কোনো শ্রমিককে এক কাজের জন্য এনে অন্য জায়গায় পুনর্বণ্টন করা হলেও একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য হবে।
এ ছাড়া অন্য শ্রম ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কোনো শ্রমিককে ব্যবহার বা গ্রহণ করলে প্রায় ৮৯ ডলারের সমতুল্য জরিমানা করা হবে। কোনো শ্রমিক যদি অনুমোদন না নিয়ে নিজের নির্ধারিত কর্মস্থল পরিবর্তন করে অন্যত্র কাজ শুরু করেন, তাহলে তাকেও প্রায় ৪৪ ডলারের সমমূল্যের জরিমানা দিতে হবে এবং এক মাসের মধ্যে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। এই বহিষ্কার প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট যাতায়াত খরচ বহন করতে হবে নিয়োগকর্তা বা দায়ী ব্যক্তিকেই। একই অপরাধ যদি পুনরায় সংঘটিত হয়, তাহলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগও থাকছে।
এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশী নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে। ফলে একের পর এক শ্রমবাজারে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরেই লাওসের বিভিন্ন খাতে কাজের জন্য পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি বাংলাদেশী শ্রমিক। এই নতুন স্থগিতাদেশের কারণে আগামী কয়েক মাসে সেই সংখ্যা কার্যত শূন্যে নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

