বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত এসেছে। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেছে বিশ্বের সেরা কার্যকরী ব্যাংকগুলোর একটি নতুন তালিকা, এবং সেই তালিকায় বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। মোট ৮৯টি দেশের ৫০০টি ব্যাংককে নিয়ে তৈরি এই তালিকায় দেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় স্বীকৃতি।
এই র্যাঙ্কিং তৈরিতে ফোর্বস একটি বাজার গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে। কোনো ব্যাংককে মূল্যায়ন করার সময় তারা নির্ভর করেছে বিশ্বস্ত আর্থিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের উপাত্ত, গভীর গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যের উপর। শুধু জনপ্রিয়তা বা ব্র্যান্ড ইমেজ নয়, বরং বাস্তব আর্থিক সক্ষমতাকেই এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় করা হয়েছে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল চারটি মূল সূচক। প্রথমত, ব্যাংকের মুনাফা করার সক্ষমতা কতটা মজবুত তা দেখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির গতি এবং আয়ের মান কতটা টেকসই তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তৃতীয়ত, মূলধন ও তহবিল ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। এবং চতুর্থত, সম্পদের গুণগত মান ও পরিচালনায় দক্ষতা কতটুকু, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এই চারটি দিক মিলিয়ে একটি সার্বিক স্কোর তৈরি করা হয়, যার ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে ক্রমানুসারে সাজানো হয়।
এখানেই থেমে থাকেনি ফোর্বসের পদ্ধতি। মোট সম্পদের আকারের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে ছয়টি ভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়েছে, যাতে ভিন্ন আকারের ব্যাংকগুলোর মধ্যে তুলনা আরও যুক্তিযুক্ত হয়। সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো, যাদের সম্পদের পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার কোটি ডলারের বেশি, তারা রয়েছে সর্বোচ্চ স্তরে। এরপর ধাপে ধাপে সম্পদের আকার কমতে থাকা ব্যাংকগুলোকে পরবর্তী স্তরগুলোতে রাখা হয়েছে, সর্বনিম্ন স্তরে রয়েছে তিনশ কোটি থেকে এক হাজার কোটি ডলার সম্পদের ব্যাংকগুলো।
এই স্তরবিন্যাসে বাংলাদেশের ব্র্যাক ব্যাংক জায়গা পেয়েছে পাঁচ নম্বর স্তরে, যা মূলত তুলনামূলক ছোট-মাঝারি আকারের ব্যাংকগুলোর জন্য নির্ধারিত। সামগ্রিক তালিকায় পাঁচশোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের অবস্থান তেয়াত্তর নম্বরে। এই তথ্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এত বিশাল সংখ্যক আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে এই অবস্থানে আসা সহজ কাজ নয়।
১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংকটি বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটিতে বর্তমানে কর্মরত আছেন সাত হাজার চারশত তিরাশি জন কর্মী, যা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিধির বিস্তৃতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।
এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী গণমাধ্যমের কাছে তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই অর্জনকে তিনি কেবল প্রতিষ্ঠানের একক সাফল্য হিসেবে দেখছেন না, বরং পুরো দেশের জন্যই এটি একটি গর্বের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিনের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের চর্চার ফলেই ব্যাংকটি ধীরে ধীরে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে। গত এক বছরে ব্যাংকটির আর্থিক সূচকগুলোতে যে উন্নতি দেখা গেছে, তাকেও তিনি এই স্বীকৃতির একটি বড় কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, আগের নেতৃত্ব ব্যাংকটিকে যে ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান দল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করে কর্মী, উদ্যোক্তা, পরিচালনা পর্ষদ, শেয়ারহোল্ডার এবং আমানতকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি ধারাবাহিক ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পেরেছে। এই বৈশ্বিক স্বীকৃতিকে তিনি সেই প্রচেষ্টার একটি বাস্তব প্রতিফলন বলে বর্ণনা করেছেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে খেলাপি ঋণের চাপ, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে নানা আলোচনা। এমন একটি প্রেক্ষাপটে একটি বেসরকারি ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত একটি র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা করে নেওয়া প্রমাণ করে যে সঠিক পরিচালনা কৌশল ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা সম্ভব। এটি একই সঙ্গে অন্যান্য দেশীয় ব্যাংকগুলোর জন্যও একটি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে পারে, যারা ভবিষ্যতে এমন বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করতে চায়।
সবমিলিয়ে, ফোর্বসের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

