মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করেছে যে পৃথিবীর কক্ষপথে একটি মহাকাশ অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে। তবে অস্ত্রটির প্রকৃতি, কার্যক্ষমতা কিংবা ঠিক কখন এটি কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
মার্কিন বিমান বাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, কক্ষপথে থাকা এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে সম্ভাব্য বৈরী কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন। সোমবার এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে এই ঘোষণার পর মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের মধ্যেই এই পদক্ষেপ সামনে এসেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যৎ সংঘাতে প্রতিপক্ষ দেশগুলো মার্কিন উপগ্রহ বা মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। যোগাযোগ, নজরদারি ও নেভিগেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রমে এসব উপগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে যে অস্ত্র মোতায়েনের কথা জানিয়েছে, সেটি কী ধরনের ব্যবস্থা—এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। মার্কিন স্পেস ফোর্সের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করা, দুর্বল করা এবং প্রয়োজন হলে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
মহাকাশ সামরিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থার একটি হতে পারে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ড. ব্লেডিন বোয়েন বিবিসিকে জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব সীমিত তথ্য রয়েছে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও সংকেত বিঘ্নকারী প্রযুক্তির কথা বলছে। এ ধরনের প্রযুক্তি প্রতিপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে।
আরেকটি সম্ভাবনা হলো গতিশক্তিনির্ভর ধ্বংসকারী ব্যবস্থা, যেখানে কোনো বস্তু সরাসরি অন্য কোনো উপগ্রহের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেটিকে অকার্যকর করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ব্যবস্থা ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, কারণ এতে বিপুল পরিমাণ মহাকাশ আবর্জনা তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ মহাকাশ কার্যক্রমের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পর চীন মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে সতর্ক করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মহাকাশকে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্স ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সাত দশকের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর নতুন একটি শাখা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল মহাকাশে থাকা মার্কিন সম্পদ, বিশেষ করে যোগাযোগ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত উপগ্রহগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া।
এর আগে ১৯৬৭ সালের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে পৃথিবীর কক্ষপথে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে ওই চুক্তির বাইরে বিভিন্ন দেশ অন্যান্য ধরনের মহাকাশ সক্ষমতা উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তিগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের উপগ্রহকে লক্ষ্য করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। কারণ আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় উপগ্রহের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে মহাকাশ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দুটি রুশ উপগ্রহ অন্তত এক ডজন ইউরোপীয় উপগ্রহের যোগাযোগ ব্যবস্থায় সম্ভবত নজরদারি চালিয়েছিল।
এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, রাশিয়া এমন একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে, যা অন্য উপগ্রহে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা রাখে বলে তাদের ধারণা। তবে রাশিয়া এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের দাবি, চীন সামরিক আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একইভাবে রাশিয়াও মহাকাশকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন।
মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ভবিষ্যতের সংঘাত কি শুধু পৃথিবীর মাটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মহাকাশও হয়ে উঠবে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন ক্ষেত্র। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মহলে মহাকাশ নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনায় প্রযুক্তির ধরন ও আন্তর্জাতিক প্রভাব—কোন দিকটি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে?

