যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য চলতি সপ্তাহটি হয়ে উঠেছে বেশ কঠিন। একের পর এক রাজনৈতিক ও নীতিগত বাধার মুখে পড়ায় ওয়াশিংটন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার আগের মতো নিরঙ্কুশ প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাধারণত দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টরা মাঝেমধ্যে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েন। তবে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একসঙ্গে কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। যার ফলে তার প্রশাসনের ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন এবং রাজনৈতিক সমর্থনের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সর্বশেষ ধাক্কাটি আসে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত থেকে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার নিয়ম কঠোর করার ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনায় বাধা দিয়েছে আদালত। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প তারই নিয়োগ দেওয়া কয়েকজন বিচারপতির সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, তারা নাকি আগের অবস্থানের মতো নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থায় বিচারপতিরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া বিচারপতিরাও সব বিষয়ে তার প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে একমত হবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় মিলবে না।
এরপর কেনেডি সেন্টার সংস্কার নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন বাধার মুখে পড়ে। ওয়াশিংটনের এই গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও আলোচনায় এসেছে, কারণ সমালোচকদের মতে এটি ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পরিচয়কে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরান ইস্যুতেও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্যসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতা ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থানের বিপরীতে ভোট দিয়েছেন। এতে নিজ দলের ভেতরেও মতপার্থক্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচ হাজার ডলারের আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকান নেতা এই পরিকল্পনা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন। ফলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন নির্ধারিত সময়ের আগেই সদস্যদের ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথকে অভিশংসনের বিষয়ে সম্ভাব্য ভোট এড়ানো হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্য দেখা গেছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ফেডারেল রিজার্ভের নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর এটি ছিল প্রথমবারের মতো সুদের হার বৃদ্ধির ঘটনা।
এই সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে এবং সুদের হার আরও কম হওয়া উচিত। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগী সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে মন্তব্যের পর কানাডা নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
ট্রাম্প এ বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তবে কানাডার সম্ভাব্য সহযোগী সদস্যপদের প্রকৃত প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়।
ইরান সংঘাতও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। কয়েক মাস ধরে চলা এই সংঘাতের শেষ কবে হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সময়ে হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দাব প্রণালীর আশপাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, আদালত, কংগ্রেস এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ট্রাম্প এর আগেও বহুবার রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তবে এবারের পরিস্থিতি তার প্রশাসনের জন্য নতুন ধরনের পরীক্ষা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় এই ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিজ দলের ভেতরের মতপার্থক্য, অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে বিতর্ক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে ট্রাম্পকে এখন আগের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক সমঝোতা ও কৌশলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তি শেষ হয়ে গেছে। অতীতেও তিনি কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহের ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার পাশাপাশি আদালত, কংগ্রেস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

