ইউরোপে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউরোপের কয়েকটি মিত্রদেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের প্রত্যাশিত সুযোগ না দেওয়ার পর ওয়াশিংটনের এই পর্যালোচনা নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা ইউরোপে মার্কিন বাহিনীর ভবিষ্যৎ উপস্থিতি নিয়ে কয়েকটি বিকল্প তৈরি করছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার থেকে শুরু করে আরও বড় পরিসরে প্রায় ৪০ হাজার সেনা এবং সংশ্লিষ্ট বিমান, জাহাজ ও অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর প্রশ্নটি শুধু ওয়াশিংটন ও ইউরোপের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, ন্যাটোর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
কেন ইউরোপীয় উপস্থিতি পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র?
গত জুনে ব্রাসেলসে ন্যাটোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ছয় মাসের একটি পর্যালোচনার ঘোষণা দেন।
তার বক্তব্য ছিল, ইউরোপকে নিজেদের প্রতিরক্ষার ‘প্রাথমিক দায়িত্ব’ আরও বেশি করে নিতে হবে এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কাঠামো এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমে।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন হেগসেথ। কয়েকটি দেশ মার্কিন বাহিনীকে ইরানে হামলার উদ্দেশ্যে তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় তিনি এর সমালোচনা করেন।
তবে ইউরোপের অবস্থান একরকম ছিল না। স্পেন ও ফ্রান্স যুদ্ধসংক্রান্ত সামরিক কার্যক্রমে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের বিরোধিতা করেছিল। যুক্তরাজ্য কিছু সীমিত প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমের অনুমতি দেয়। অন্যদিকে ইতালি ও রোমানিয়াসহ কয়েকটি মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছিল।
কী কী বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপে স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকা আনুমানিক ৬৮ হাজার মার্কিন সেনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রত্যাহারের একটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে।
আরও বড় একটি বিকল্পে প্রায় ৪০ হাজার সেনার পাশাপাশি সামরিক বিমান, জাহাজ ও অন্যান্য অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে সব পরিকল্পনাই যে ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার—তা নয়। মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের কিছু ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলে, অর্থাৎ রাশিয়ার কাছাকাছি দেশগুলোতে পুনর্বিন্যাসের কথাও বিবেচিত হচ্ছে।
পেন্টাগনের পর্যালোচনার আওতায় অন্তত চারটি বিকল্প তৈরির কথা রয়েছে। হেগসেথের কাছে মূল সুপারিশ পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ নভেম্বর। এরপর যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

ইতিমধ্যে সেনা কমানো শুরু হয়েছে
ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমানোর বিষয়টি শুধু পরিকল্পনার পর্যায়ে নেই। এরই মধ্যে কিছু পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
রোমানিয়ায় মোতায়েন থাকা প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনার প্রায় অর্ধেক ইতিমধ্যে চলে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জার্মানি থেকেও প্রায় পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে। মে মাসে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে পেন্টাগন। জার্মানিতে তখন প্রায় ৩৬ হাজারের বেশি স্থায়ী মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল।
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, একপর্যায়ে জার্মানিসহ ইউরোপ থেকে আরও বড় সংখ্যায় সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের ভেতরের মতপার্থক্যের কারণে সেই পরিকল্পনা এগোয়নি।
ইউরোপের নিরাপত্তায় কী প্রভাব পড়তে পারে?
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইয়ান লেসারের মতে, ব্যাপকভাবে মার্কিন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হলে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও পারমাণবিক প্রতিরোধ কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে কোন ঘাঁটি থেকে কী ধরনের বাহিনী সরানো হচ্ছে এবং সেগুলো অন্য কোথাও পুনর্মোতায়েন করা হচ্ছে কি না তার ওপর।
উদাহরণ হিসেবে, পশ্চিম ইউরোপ থেকে কিছু সেনা ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে স্থানান্তর করা হলে সেটিকে সরাসরি সামরিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা নাও যেতে পারে। কারণ জার্মানি, ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশও নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে বড় ধরনের প্রত্যাহার হলে শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের সামরিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। জার্মানির রামস্টাইনসহ ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিগুলো শুধু ন্যাটো প্রতিরক্ষার জন্য নয়; মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন অভিযান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এ কারণেই ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতাও বড় ধরনের সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জার্মানি থেকে সেনা কমানোর সিদ্ধান্তের পর সিনেটর রজার উইকার ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য মাইক রজার্স বলেন, এমন পদক্ষেপ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ‘ভুল বার্তা’ পাঠাতে পারে।
ন্যাটো নিয়ে পুরোনো বিরোধ আরও গভীর
ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ নতুন নয়। প্রথম মেয়াদ থেকেই তিনি অভিযোগ করে আসছেন, ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যরা নিজেদের প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
তবে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ন্যাটো সদস্যরা বড় পরিবর্তন এনেছে।
২০২৫ সালের হেগ সম্মেলনে জোটের সদস্যরা ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপির মোট ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ের অঙ্গীকার করে। এর মধ্যে অন্তত ৩.৫ শতাংশ সরাসরি সামরিক ও মূল প্রতিরক্ষা প্রয়োজন এবং সর্বোচ্চ ১.৫ শতাংশ অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা, বেসামরিক প্রস্তুতি ও অন্যান্য নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় করা হবে।
২০২৬ সালে ন্যাটো জানিয়েছে, ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডা আগের বছরের তুলনায় প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধ থেকে শুল্ক—বাড়ছে দূরত্ব
ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নিয়ে স্পেনসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ প্রকাশ্যে সমালোচনামুখর হয়েছে। ওয়াশিংটন আবার অভিযোগ করেছে, সংকটের সময় কিছু মিত্র প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা দেয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য বিরোধ। ইউরোপীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক, ইউক্রেন নীতি এবং গত বছর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন চাপ তৈরি করেছিল।
তবে শুক্রবার গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নতুন সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সরকার জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে, তবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্ক ও স্থানীয় সরকারের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। চুক্তিটি এখনো সংশ্লিষ্ট পার্লামেন্টগুলোর অনুমোদনের অপেক্ষায়।
এশিয়াতেও বাড়ছে প্রশ্ন
ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু মার্কিন সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগস্টে এশিয়ায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয় ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের জায়গা নিতে। এতে চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ সক্ষমতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।
ট্রাম্প এর আগেও বলেছিলেন, তাইওয়ানের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার জন্য আরও বেশি মূল্য দেওয়া। ফলে ইউরোপের মতো এশিয়াতেও ওয়াশিংটনের মিত্রদের নিজেদের প্রতিরক্ষার বৃহত্তর অংশ বহনের চাপ বাড়ছে।
শুধু সেনা কমানো নয়, কৌশল বদলের ইঙ্গিত
ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর আলোচনা তাই শুধু কয়েক হাজার সেনা কোথায় থাকবে—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ন্যাটোর ভেতরে দায়িত্ব ভাগাভাগি, রাশিয়াকে প্রতিরোধ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অগ্রাধিকার এবং একই সময়ে ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরে ওয়াশিংটনের শক্তি ধরে রাখার সক্ষমতা।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। কিন্তু ২৫ হাজার বা ৪০ হাজার সেনা প্রত্যাহারের মতো বিকল্পগুলো যে পেন্টাগনের আলোচনার টেবিলে এসেছে, সেটিই ইঙ্গিত দেয়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে গড়ে ওঠা মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কাঠামো আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা

