ইউক্রেনজুড়ে ব্যাপক ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাতভর চালানো এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষ্ণ সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজেও হামলা চালানোর দাবি করেছে মস্কো। প্রতিবেশী পোল্যান্ড পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুদ্ধবিমান উড়িয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছিল। সূত্র: আল-জাজিরা
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী শনিবার জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত রাশিয়া মোট ১৭৪টি আক্রমণ ও বিভ্রান্তিমূলক ড্রোন ছোড়ে। এর মধ্যে শাহেদ, গেরবেরা ও অন্যান্য ড্রোন ছিল। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোনের প্রায় অর্ধেক ছিল জেটচালিত। পাশাপাশি রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চল থেকে দুটি জিরকন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়। হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ওডেসা ও কিয়েভ অঞ্চল।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর দাবি, সকাল আটটা পর্যন্ত ১৪১টি আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু ভূপাতিত অথবা ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। ১৫টি স্থানে হামলার আঘাত এবং আরও নয়টি স্থানে ভূপাতিত ড্রোন বা ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। দুটি জিরকন ক্ষেপণাস্ত্রই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি বলেও দাবি করেছে কিয়েভ।
খারকিভ ও খেরসনে প্রাণহানি
খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ সিনাইহুবভ জানিয়েছেন, ১৪টি বসতিতে রুশ হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। বালাক্লিয়া ও লিপকুভাতিভকাসহ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
খেরসন অঞ্চলের গভর্নর ওলেক্সান্ডার প্রোকুডিনের তথ্য অনুযায়ী, ২৫টি জনপদে গোলাবর্ষণে আরও তিনজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। হামলায় বহুতল আবাসিক ভবন, ব্যক্তিগত বাড়ি, একটি মোবাইল যোগাযোগ টাওয়ার ও গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দনিপ্রোপেত্রোভস্কেও ড্রোন, কামান ও আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা বোমা ব্যবহার করে চারটি এলাকায় ১০টির বেশি হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক প্রশাসনের প্রধান ওলেক্সান্ডার গানঝা।
সেখানে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। দনিপ্রোতে গুদামঘর, পাভলোহ্রাদে একটি বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাকেন্দ্র, নিকোপোলে একটি শপিং সেন্টার এবং ক্রিভি রিহ ও সিনেলনিকির কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষ্ণ সাগরের দুই জাহাজে হামলার দাবি রাশিয়ার
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কৃষ্ণ সাগরে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে ‘গেরান-৪ সিকার’ লোইটারিং ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
রুশ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, একটি ইউক্রেনীয় শুষ্ক পণ্যবাহী জাহাজ ওডেসার দিকে যাচ্ছিল এবং অন্যটি ওডেসা বন্দরে নোঙর করা একটি ট্যাংকার। মস্কোর দাবি, দুটি জাহাজেই সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করা হচ্ছিল। তবে জাহাজে সামরিক পণ্য থাকার এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কৃষ্ণ সাগরে বেসামরিক নৌযানও রুশ হামলার শিকার হয়েছে। এর আগে একটি রুশ ড্রোনের আঘাতে তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন নিহত হন বলে জানিয়েছিল এপি।
যুদ্ধবিমান ওড়াল পোল্যান্ড
ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক রুশ ড্রোন হামলার সময় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে প্রতিবেশী ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ড।
পোলিশ সশস্ত্র বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড জানায়, ইউক্রেনে জেটচালিত রুশ ড্রোনের হামলার কারণে পোল্যান্ডের নিজস্ব আকাশসীমায় সামরিক বিমান অভিযান শুরু করা হয়েছিল।
একই সঙ্গে ভূমিভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার নজরদারি ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখা হয়। কমান্ড জানায়, প্রয়োজনীয় বাহিনী ও সরঞ্জাম সক্রিয় করা হয়েছিল মূলত সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
তবে কিছু সময় পর অভিযান শেষ করা হয় এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ও রাডার ইউনিট স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যায়। পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এ সময় দেশটির আকাশসীমা লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা শনাক্ত হয়নি।
পূর্বাঞ্চলে অগ্রগতির দাবি মস্কোর
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইউক্রেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে তাদের স্থলবাহিনীর অভিযান আরও জোরদার হয়েছে।
মস্কোর দাবি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে রুশ বাহিনী ৫ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরেই প্রায় ৬৭০ বর্গকিলোমিটার দখলের দাবি করেছে তারা। তবে এসব ভূখণ্ডগত অগ্রগতির হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও দাবি করেছে, জাপোরিঝিয়ার দিকে তাদের বাহিনী অগ্রসর হচ্ছে এবং ক্রামাতোরস্ক-স্লোভিয়ানস্ক নগরাঞ্চলের প্রবেশপথে বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে।
রাতের এই হামলার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো জেটচালিত ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার। ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনীর হিসাবে, রাশিয়ার পাঠানো শাহেদ ড্রোনের প্রায় অর্ধেকই ছিল জেটচালিত। প্রচলিত প্রপেলারচালিত ড্রোনের তুলনায় এগুলোর গতি বেশি হওয়ায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে।
একই সঙ্গে কৃষ্ণ সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং রুশ ড্রোন তৎপরতার কারণে পোল্যান্ডের যুদ্ধবিমান মোতায়েন দেখাচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেনের স্থলসীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; কৃষ্ণ সাগরের বাণিজ্যপথ ও ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তেও নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ছে।

