পচে যাওয়া খাদ্যবর্জ্য বিশ্বে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের একটি বড় উৎস হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক মোট নিঃসরণের প্রায় ১০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। সংস্থাটির হিসাবে, এ পরিমাণ বিশ্বের উড়োজাহাজ পরিবহন খাতের নিঃসরণের প্রায় পাঁচ গুণ। ফলে খাবার অপচয় কমানো এখন শুধু খাদ্যব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, জলবায়ু সংকট মোকাবিলারও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গ্রিনহাউজ গ্যাস বা কার্বন নিঃসরণ এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। কারণ, জলবায়ু সংকট এখন কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়, অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা, খরা ও চরম আবহাওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। ইউএনইপি খাদ্যবর্জ্যকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
খাদ্যবর্জ্য বলতে শুধু পাতের উচ্ছিষ্ট বোঝায় না। এর মধ্যে আছে অপচয় হওয়া খাবার এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া কৃষিপণ্য। ফসল তোলার পর বাজারে বা দোকানে পৌঁছানোর আগেই যে খাবার নষ্ট হয়, সেটিও এর অংশ।
তবে জলবায়ুর জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হলো পচে যাওয়া খাবার। এসব খাবার ময়লার ভাগাড়ে জমা হলে সেখানে অক্সিজেনের অভাবে জৈব পদার্থ পচতে থাকে। অণুজীবের ক্রিয়ায় এ সময় তৈরি হয় মিথেন গ্যাস।
কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছরের হিসাবে মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে প্রায় ৮৬ গুণ বেশি তাপ আটকে রাখতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী এই গ্যাস। সেই হিসাবে পচা খাদ্যবর্জ্য বিশ্বজুড়ে মিথেন নিঃসরণের অন্যতম প্রধান উৎস।
খাবার অপচয়ের পরিমাণও বিশাল। ইউএনইপির প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে প্রতিদিন ১০০ কোটির বেশি খাবার খাওয়া হয় না, অর্থাৎ ফেলে দিতে হয়। এর ৬০ শতাংশই আসে সাধারণ পরিবার থেকে। এর অর্থ, সমস্যার বড় অংশ তৈরি হচ্ছে ঘরের রান্নাঘর ও খাবার টেবিল থেকেই। তাই ব্যক্তি ও পরিবারের সচেতনতার ওপরও এর সমাধান অনেকটা নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খাবার নষ্ট হলে শুধু খাবারটিই যায় না, সেটি উৎপাদনে ব্যবহৃত সম্পদও নষ্ট হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও জানিয়েছে, বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর কৃষিজমিতে এমন খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত কেউ খায় না। এটি বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ।
একইভাবে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত পানিও অপচয় হয়। এর সঙ্গে আছে বন উজাড়ের প্রশ্ন। কৃষিজমি বাড়াতে অনেক সময় বন কেটে ফেলা হয়। অর্থাৎ যে খাবার শেষ পর্যন্ত মানুষের পেটেই যায় না, তার জন্যও গাছ কাটতে হচ্ছে। এতে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে খাবার অপচয়ের প্রভাব শুধু পচে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জমি, পানি ও বনসম্পদের ক্ষতিও জড়িয়ে আছে, আর বাড়ছে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ।
তবে এই সংকটের মধ্যেও একটি আশার দিক আছে। বিশ্লেষকদের মতে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বায়ুমণ্ডলে মিথেন কম সময় থাকে। তাই এখন মিথেন নিঃসরণ কমাতে পারলে কয়েক দশকের মধ্যেই জলবায়ুতে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখা সম্ভব। কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষেত্রে এই সুফল পেতে অনেক বেশি সময় লাগে। সে হিসাবে খাদ্যবর্জ্য কমানো তুলনামূলক দ্রুত ফল দেওয়া একটি পথ।
ইউএনইপির কর্মকর্তা মার্টিন ক্রাউস বলেন, বিশ্ব এখন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দ্রুত কমানোর বাস্তবসম্মত উপায় খুঁজছে। এ অবস্থায় খাদ্যবর্জ্য কমানো অন্যতম দ্রুত ও কম খরচের সমাধান হতে পারে।
কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। এফএও বলছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০১৫ সালের পর থেকে খাবার অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু বৈশ্বিক খাবার অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বিশ্ব অনেক দূরে আছে। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক থেকেই যাচ্ছে।
এর মধ্যে বিভিন্ন দেশ খাদ্যবর্জ্য থেকে মিথেন নিঃসরণ কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও বর্জ্য সংগ্রহকারীদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা হচ্ছে। আবার কোথাও জৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে কাজে লাগানো হচ্ছে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই নামের এক ধরনের মাছি। এই মাছি খাবারের উচ্ছিষ্টসহ অন্যান্য জৈব বর্জ্য খেয়ে তা কাজে লাগানোর উপযোগী করে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এই মাছি পালন করছে।
সব মিলিয়ে খাবার অপচয় কমানো গেলে একই সঙ্গে বর্জ্য থেকে মিথেন নিঃসরণও কমবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ধীর হবে, আর খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত জমি ও পানির অপচয়ও কমবে। তাই নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবার, সবার জন্যই খাবার অপচয় রোধ এখন জলবায়ু সংকট মোকাবিলার একটি বাস্তব ও জরুরি পদক্ষেপ।

