ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত আবারও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিধি সৌদি সীমান্তবর্তী এলাকা ছাড়িয়ে রাজধানী রিয়াদ, পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর দাম্মাম এবং দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যন্ত পৌঁছেছে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার ঘটনা সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে সৌদি নাগরিক ছাড়াও বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, মিসর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের নাগরিক ছিলেন।
এই হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ঘটনা নয়; বরং এটি হুথিদের যুদ্ধকৌশলের পরিবর্তিত রূপ তুলে ধরেছে। অতীতে হুথিদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তবর্তী সামরিক স্থাপনা। কিন্তু বর্তমানে তারা বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে। রিয়াদ বিমানবন্দরের পাশাপাশি দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশেও হামলার ঘটনা সৌদিকে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
হুথিদের হামলার বিস্তার ও নতুন কৌশল
হুথিদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তাদের অস্ত্র ব্যবহারের ধরনে। ছোট আকারের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হয়েও তারা এখন দীর্ঘপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল এবং আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে সৌদির মতো বৃহৎ সামরিক শক্তিকে চাপে ফেলছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের কৌশল হলো সৌদি আরবের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা নয়; বরং কম খরচের অস্ত্র দিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে সৌদিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়।
এই কৌশলকে সামরিক বিশ্লেষণে অসম যুদ্ধ (asymmetric warfare) বলা হয়। অর্থাৎ একটি পক্ষের কাছে আধুনিক বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলেও অন্য পক্ষ তুলনামূলক সস্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। হুথিদের হামলা দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু অস্ত্রের সংখ্যা নয়, বরং প্রতিপক্ষের দুর্বল জায়গা শনাক্ত করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদির বড় সামরিক শক্তি বিপরীতে চ্যালেঞ্জও বড়
কাগজে-কলমে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক প্রযুক্তি কিনেছে। সৌদির কাছে প্যাট্রিয়ট (Patriot) এবং অন্যান্য উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিগত সুবিধা পুরোপুরি ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ সৌদি আরবকে একটি বিশাল ভূখণ্ড, দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিপুল সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনা রক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই শতভাগ কার্যকর নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করার সক্ষমতা থাকলেও প্রতিটি সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু একইভাবে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন।
২০১৯ সালের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলা এই বাস্তবতা স্পষ্ট করেছিল। সেই হামলায় সৌদি আরামের তেল উৎপাদন সাময়িকভাবে বড় আকারে ব্যাহত হয়েছিল এবং বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনা দেখিয়েছিল, তুলনামূলক কম খরচের একটি আক্রমণও বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রের ওপর বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
পশ্চিমাদের মিত্রদের অবস্থানে সৌদির হতাশা কেন?
সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে পশ্চিমা মিত্রদের ভূমিকা নিয়ে। রিয়াদের ধারণা, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে তাদের যে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, বর্তমান সংকটে তার প্রতিফলন প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, পশ্চিমা মিত্রদের সীমিত সহায়তায় সৌদি হতাশা বাড়ছে। যুক্তরাজ্য সৌদিকে একটি ট্যাঙ্কার বিমান সরবরাহ করলেও অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সহায়তার জন্য রিয়াদের কিছু অনুরোধ এখনো অনুমোদিত হয়নি।
সৌদি অসন্তোষ বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি নিরাপত্তা সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। বহু দশক ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি ছিল- সৌদি আরবের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বড় মার্কিন অস্ত্র ক্রেতা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই রিয়াদের প্রত্যাশা ছিল, হুথিদের মতো একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন তাদের রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র আরও সরাসরি ভূমিকা নেবে।
কিন্তু ওয়াশিংটনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক। অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে সেই পদক্ষেপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বরং গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহযোগিতার দিকে বেশি জোর দিয়েছে।
এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কৌশলগত হিসাব রয়েছে। প্রথমত, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় সামরিক সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়তে চায় না। ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন আঞ্চলিক মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নিতে উৎসাহিত করছে। দ্বিতীয়ত, হুথিদের বিরুদ্ধে বড় আকারের মার্কিন হামলা হলে ইরান-সমর্থিত অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধসহ অন্যান্য বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকটে সামরিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা করছে।
সৌদি দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি হলো, তারা মনে করছে, হুথি হুমকি এখন শুধু ইয়েমেনের সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হুথিরা সৌদির রাজধানী, বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ফলে রিয়াদ মনে করছে, এটি শুধু সৌদির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা নয়; বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
এই হতাশার আরেকটি কারণ হলো, সৌদি আরব মনে করে তারা বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে এসেছে। কিন্তু যখন বাস্তবে বড় ধরনের হুমকি তৈরি হয়েছে, তখন পশ্চিমা দেশগুলো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে সীমিত সহায়তার পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে রিয়াদের মধ্যে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে?
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থানও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয়। যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা হিসেবে আকাশে জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে এবং ফ্রান্স সৌদির ইয়ানবু বন্দরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সৌদির প্রত্যাশা ছিল আরও বড় ধরনের সহায়তা- বিশেষ করে আক্রমণাত্মক অভিযান, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ।
হুথিদের শক্তি এখন শুধু ইয়েমেনে সীমাবদ্ধ নয়
বর্তমান সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হুথিরা এখন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকারী একটি গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালীর কাছে তাদের কার্যক্রম সৌদি আরবের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
বাব আল-মানদেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়। এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে শুধু সৌদি নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও প্রভাবিত হতে পারে।
সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। কিন্তু লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব যদি অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই বিকল্প ব্যবস্থার কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সৌদির সামনে সামরিক না কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের কাছে সামরিক প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তারা বিমান হামলা বাড়াতে পারে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে পারে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
কিন্তু গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে হুথি সমস্যার সমাধান করা কঠিন। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযান হুথিদের বড় ধরনের ক্ষতি করলেও তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি।
তাই সৌদির বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধু হুথিদের হামলা প্রতিহত করা নয়; বরং এমন একটি কৌশল তৈরি করা, যেখানে সামরিক প্রতিরক্ষা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সমঝোতা একসঙ্গে কাজ করবে।
শেষ পর্যন্ত সৌদির হতাশার মূল কারণ হলো, তারা সামরিক শক্তির অভাবে নয়, বরং একটি নতুন ধরনের যুদ্ধ বাস্তবতার কারণে চাপে পড়েছে। হুথিরা দেখিয়েছে, একটি ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠীও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় রাষ্ট্রের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত পরিকল্পনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আর এই কারণেই রিয়াদ এখন শুধু অস্ত্র নয়, বরং আরও দৃঢ় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা খুঁজছে।

