ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল নিরাপত্তা সংকটগুলোর একটি। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। যে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার ঘটনা সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও এসব হামলার গভীরের সফলতা নিয়ে হুথিদের দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবে ঘটনাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, হুথিরা এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়; তারা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক দেশ। দেশটির রয়েছে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট। এরপরও ইয়েমেনের তুলনামূলক দরিদ্র একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী কীভাবে রিয়াদ, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারছে- এই প্রশ্নই এখন সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার অন্যতম বিষয়।
এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু বর্তমান হামলা নয়, বরং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাস, সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতা বুঝতে হবে।
রিয়াদে হামলা, নতুন করে জটিল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশকে তারা বহুবার সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ওই হামলায় সাময়িকভাবে সৌদি তেল উৎপাদনের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত শক্তিকে দায়ী করেছিল, যদিও হুথিরা হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
সাম্প্রতিক হামলার ক্ষেত্রেও মূল উদ্বেগ হলো, হুথিরা কতটা দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সৌদির মতো একটি দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কতটা চাপে ফেলতে পারছে।
সৌদি আরবের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আধুনিক যুদ্ধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসঙ্গে অনেক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটি উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলা সম্ভব। কারণ প্রতিটি হামলা ঠেকাতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারও বড় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ব্যয় হয়।
হুথিদের কৌশল মূলত অসম যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে। তারা বড় কোনো প্রচলিত সেনাবাহিনীর মতো যুদ্ধ না করে কম খরচের অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।
হুথিদের উত্থান, কেন সৌদিকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে?
হুথিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। ১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনের জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে তাদের উত্থান ঘটে। প্রতিষ্ঠাতা নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই তারা ‘হুথি’ নামে পরিচিত হয়।
প্রথমদিকে তাদের আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল ইয়েমেনের রাজনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। ২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করলে দেশটি বড় ধরনের গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে চলে যায়।
এরপর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। সৌদি আরবের যুক্তি ছিল- ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
অন্যদিকে হুথিরা সৌদি আরবকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপকারী শক্তি হিসেবে দেখে। তাদের কাছে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযান ছিল আগ্রাসন; আর সৌদি আরবের কাছে হুথিরা সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
এই দ্বন্দ্বের পেছনে শুধু ইয়েমেনের রাজনীতি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দুই বড় আঞ্চলিক শক্তি – সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কাজ করছে।
হুথিরা কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে শক্তিশালী হয়ে উঠল?
হুথিদের সামরিক শক্তির বড় পরিবর্তন এসেছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার উন্নতির মাধ্যমে। একসময় গেরিলা যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকা এই গোষ্ঠী এখন দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম একটি সশস্ত্র শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
হুথিদের হাতে থাকা প্রধান অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, আত্মঘাতী ড্রোন এবং বিস্ফোরকবাহী নৌযান। ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করার দাবি করেছে। আর কম খরচের আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করে তারা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করে।
লোহিত সাগর অঞ্চলে বিস্ফোরকবাহী নৌযানের ব্যবহারও হুথিদের কৌশলের অংশ, যা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে। তবে হুথিরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং দাবি করে, তারা নিজেদের সক্ষমতায় এসব অস্ত্র তৈরি ও পরিচালনা করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত কোনো গোষ্ঠী নয়। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ইয়েমেনকেন্দ্রিক স্বার্থ রয়েছে। তবে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ।
ইরান, লোহিত সাগর ও সৌদির নিরাপত্তা সংকট
হুথিদের গুরুত্ব শুধু ইয়েমেনের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এটি। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলকারী জাহাজের একটি বড় অংশ এই পথ ব্যবহার করে।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুথিরা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের অংশ। তবে এসব হামলার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। কিন্তু এসব পদক্ষেপও গোষ্ঠীটির সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
সৌদি আরবের জন্য সমস্যা আরও বড়, কারণ দেশটির অর্থনীতি ব্যাপকভাবে জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক হিসেবে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
যদিও সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুথিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করেছে, তবুও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে পুরোনো সংঘাত আবার সামনে চলে আসে।
হুথিদের শক্তির মূল রহস্য কোথায়?
হুথিদের শক্তি শুধু তাদের অস্ত্রভান্ডারে নয়; বরং তাদের যুদ্ধের ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতায়।
সৌদি আরবের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক বিজয় অর্জন করা তাদের লক্ষ্য নয়। বরং সীমিত খরচে হামলা চালিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা, আঞ্চলিক আলোচনায় নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো এবং প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখাই তাদের কৌশলের মূল অংশ।
অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে এই হুমকি মোকাবিলা করা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় হুথি সংকট শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধ নয়; এটি ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় ভূরাজনৈতিক লড়াই।

