যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার জনপ্রিয় কর্মসূচি ডাইভারসিটি ভিসা বা ডিভি লটারি ২০২৭ আবার চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন আদালত। নিবন্ধনের সময়সূচি প্রকাশ এবং আবেদন গ্রহণ শুরু করতে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরকে নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন আদালত। নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনের বিস্তারিত সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে এবং ১ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরু করতে হবে। তবে বাংলাদেশসহ কোন কোন দেশের নাগরিক এবার আবেদন করতে পারবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতের বিচারক জিনসুক ওহতা গত ১৪ অক্টোবর এ বিষয়ে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। ডিভি লটারি নিয়ে কাজ করা রেড ঈগল ল নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, ২০২৭ অর্থবছরের লটারির নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা না করায় কার্যত কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আদালত কর্মসূচি চালুর নির্দেশ দেওয়ার পর দুই পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে সময়সীমা সংশোধন করা হয়।
আদালতের সংশোধিত আদেশ অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে নিবন্ধনের শুরুর ও শেষের তারিখ, আবেদন করার ওয়েবসাইট এবং অংশগ্রহণের শর্ত প্রকাশ করতে হবে। এরপর ১ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরু করতে হবে। নিবন্ধন চলবে ৩০ দিন। নির্বাচিত আবেদনকারীদের ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ফলাফল জানানোর নির্দেশও রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আদালত সময়সীমা বেঁধে দিলেও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে ডিভি ২০২৭-এর নিবন্ধনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দপ্তরটি জানিয়েছিল, আবেদনপ্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং সময়সূচি পরে জানানো হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রশাসন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলও করেছে। আদেশ বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
ডিভি লটারি এমন একটি অভিবাসন কর্মসূচি, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক কম অভিবাসী পাঠায় এমন দেশের যোগ্য নাগরিকেরা স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিসার জন্য আবেদন করার সুযোগ পান। কর্মসূচিটির মাধ্যমে প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ডাইভারসিটি ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে নির্বাচিত ব্যক্তিদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য বরাদ্দও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ৫৫ হাজার ভিসা শুধু মূল আবেদনকারীদের জন্য নয়।
লটারিতে নির্বাচিত হওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া নয়। আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অথবা নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি কাগজপত্র যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং অন্যান্য অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। সব শর্ত পূরণ করলেও ভিসার সংখ্যা সীমিত থাকায় নির্বাচিত প্রত্যেক ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত ভিসা পাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।
২০২৭ সালের আবেদন শুরুর আগে সম্ভাব্য আবেদনকারীদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিধি অনুযায়ী, সাধারণভাবে আবেদন করার সময় মেয়াদ থাকা বৈধ পাসপোর্টের তথ্য দিতে হবে এবং পাসপোর্টের পরিচিতি ও স্বাক্ষরসংক্রান্ত পাতার স্ক্যান কপি জমা দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত চূড়ান্ত বিধি অনুযায়ী, ডিভি লটারিতে নিবন্ধনের জন্য এক ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আগের মতো নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে হবে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। আবেদন গ্রহণের নির্দিষ্ট তারিখ ও চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রকাশিত হলে সেগুলো মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। আবেদন করতে হবে নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইটে। একই ব্যক্তির নামে একাধিক আবেদন করলে সব আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই দালাল বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন না করে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।
বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিভি লটারি চালু হওয়ার খবর মানেই বাংলাদেশিরা আবেদন করতে পারবেন, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৬ সালের ডিভি লটারির যোগ্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না। তবে ২০২৭ সালের জন্য দেশভিত্তিক যোগ্যতার তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নতুন নির্দেশনায় বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সাধারণত আবেদনকারীর জন্মদেশের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারিত হয়, শুধু নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামী বা স্ত্রীর জন্মদেশ কিংবা বাবা মায়ের জন্মদেশের ভিত্তিতে যোগ্যতা বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে। তাই আবেদন শুরুর আগে ২০২৭ সালের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনায় যোগ্য দেশের তালিকা এবং ব্যতিক্রমের শর্ত যাচাই করা জরুরি।
১৯৯০ সালের ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ডিভি লটারি কর্মসূচির সূচনা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে যেসব দেশের মানুষের অভিবাসনের সুযোগ তুলনামূলক কম, তাঁদের জন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের একটি বিকল্প পথ তৈরি করা। এবার আদালতের নির্দেশে কর্মসূচিটি চালুর পথ তৈরি হলেও চূড়ান্ত আবেদনপ্রক্রিয়া, যোগ্যতার শর্ত এবং সময়সূচি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাই অনুসরণ করতে হবে।

