সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও আটজন। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বুধবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় একের পর এক হামলার ধারাবাহিকতায় এটি সর্বশেষ ঘটনা। এতে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তার ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশনের বিবৃতি অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হামলা কীভাবে চালানো হয়েছে, তা বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
একই দিন সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, সৌদি আরামকোর সায়বাহ তেলক্ষেত্রের অবকাঠামোয় ড্রোন হামলার চেষ্টা হয়েছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একটি ড্রোন শনাক্ত করে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। তবে ওই ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী রিয়াদসহ সৌদির বিভিন্ন বিমানবন্দরে লাগাতার হামলা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এর একদিন পর, ১১ অক্টোবর আরেকটি বিমানবন্দরে হামলা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্যে, ওই ঘটনায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
এসব হামলার ধারাবাহিকতা বলছে, লক্ষ্যবস্তু মূলত বেসামরিক চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামো। ফলে হামলার প্রভাব শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না, দেশটির অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইয়েমেনে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত। দেশটির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, তা নিয়েই এই লড়াই। সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট।
হুতিদের বিভিন্ন স্থাপনায় সৌদি জোটের হামলার জবাবে গোষ্ঠীটি সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হুতিদের ঠেকাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আবার একজোট হয়েছে, যা ইয়েমেন যুদ্ধকে নতুন মোড়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণ রয়েছে।
একের পর এক হামলার পর সৌদি আরবে ভ্রমণ ও অবস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। দেশটির প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভের এ বছরের আয়োজন বাতিল করা হয়েছে। মরুভূমির দাভোস নামেও পরিচিত এই সম্মেলনকে বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা হিসেবে দেখা হয়। হামলার ভয়ে সেটি না হওয়ায় বিনিয়োগ-পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার একটি নির্দেশনা জারি করেছে। এতে সৌদি আরবের মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়তে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের আরও কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকেও মার্কিন কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস তাদের নিরাপত্তা সতর্কবার্তায় সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের পক্ষ থেকে আরও হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা চলছে। সায়বাহ তেলক্ষেত্রের ঘটনায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোন প্রতিহত করলেও প্রাণহানি ঠেকানো যায়নি। অন্যদিকে বিমানবন্দরের মতো জনবহুল স্থাপনায় বারবার হামলা হওয়ায় সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে। রিয়াদে বসবাসকারী প্রবাসীদের অনেকে এখন শহরটিকে আগের মতো নিরাপদ মনে করছেন না বলেও খবর রয়েছে।
ইয়েমেনের লড়াই যতদিন চলবে এবং হুতি-সৌদি পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকবে, ততদিন সৌদির বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে বিমান চলাচল, বিনিয়োগ ও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দাম্মামের ঘটনায় হামলার দায় কেউ স্বীকার করেছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি।

