গত ২৮ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারবাজারে যাত্রা উপলক্ষে বড় আয়োজন করা হয়। সংগীত পরিবেশনা, ড্রোন প্রদর্শনী এবং তারকাদের অংশগ্রহণে উদ্যাপন করা হয় এই অভিষেক। শেয়ারবাজার থেকে ৩২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে জিও, যা ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব।
প্রথম দিনেই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ২১ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে জিওর বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ভারতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে এর চেয়ে বেশি বাজারমূল্য রয়েছে শুধু মূল প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের।
বর্তমানে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি। প্রতিষ্ঠানটির বড় অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা ও গুগল। ২০২০ সালে এই দুই প্রতিষ্ঠান জিওতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল।
২০১৬ সালে বিনা মূল্যের ইন্টারনেট দিয়ে যাত্রা
২০১৬ সালে জিও ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারে প্রবেশের সময় দেশটিতে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গিগাবাইট মোবাইল ডেটার গড় মূল্য ছিল প্রায় ৭ ডলার।
এমন পরিস্থিতিতে জিও কয়েক মাসের জন্য বিনা মূল্যে ডেটা ব্যবহারের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি বিনা মূল্যে সিম বিতরণ শুরু করে। ফলে ভারতের বিভিন্ন শহরে সিম সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
ব্যবসা শুরুর মাত্র ১৭০ দিনের মধ্যে জিওর গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। সে সময় বিশ্বব্যাপী কোনো মোবাইল অপারেটরের জন্য এত দ্রুত গ্রাহক অর্জনের ঘটনা ছিল বিরল।
তবে এই বাজারে প্রবেশ সহজ ছিল না। নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, তরঙ্গ কেনা এবং ফাইবার সংযোগ তৈরিতে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল রিলায়েন্স।
মূলত রিলায়েন্সের বিপুল আর্থিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জিও প্রথম দিকে পরিচালন লোকসান মেনে নিয়েও গ্রাহক বাড়ানোর কৌশল নেয়। এর ফলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাধ্য হয়ে ইন্টারনেটের দাম কমায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার দ্রুত বাড়তে থাকে।
তিন বছরেই দেশের বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর
জিওর বাজারে প্রবেশের মাত্র তিন বছরের মধ্যে গ্রাহকসংখ্যার বিচারে ভারতের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটরে পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে আম্বানির পরিকল্পনা শুধু মোবাইল যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধীরে ধীরে জিওকে একটি বিস্তৃত ডিজিটাল সেবাব্যবস্থায় রূপ দেওয়া হয়।
জিওসিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র, বিনোদন ও খেলাধুলার অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি জিওক্লাউডের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালু করা হয়।
এতে গ্রাহকদের দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে জিওর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। শুধু ইন্টারনেট সংযোগ নয়, বিনোদন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব গ্রাহকভিত্তি আরও শক্তিশালী করে।
জিওর উত্থানে বাজার থেকে হারিয়ে যায় সাত প্রতিষ্ঠান
জিওর দ্রুত সম্প্রসারণ ভারতের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার সূচনা করলেও এর প্রভাব সব প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক ছিল না।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিও বাজারে প্রবেশের পর ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে প্রতি গ্রাহকের বিপরীতে টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় আয় ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। ২০১৬ সালে যেখানে এই আয় ছিল প্রায় ১ দশমিক ৩২ ডলার, ২০১৯ সালে তা নেমে আসে ০ দশমিক ৭৫ ডলারে।
দীর্ঘস্থায়ী মূল্যযুদ্ধের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে। ভারতের আগে থেকে ব্যবসা করা ১০টি অপারেটরের মধ্যে সাতটি দেউলিয়া হওয়া কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে বাজার ছাড়ে।
এয়ারসেল, ভিডিওকন, টেলিনর ইন্ডিয়া, টাটা টেলিসার্ভিসেস এবং রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে মুকেশ আম্বানির ছোট ভাই অনিল আম্বানির প্রতিষ্ঠিত রিলায়েন্স কমিউনিকেশনস বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হওয়ার প্রক্রিয়ায় যায়।
বর্তমানে ভারতের টেলিযোগাযোগ বাজারের ৯২ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে জিও, এয়ারটেল ও ভোডাফোন আইডিয়া—এই তিন প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতিযোগিতার পরিধি অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে।
গ্রাহকদের জন্য সস্তা ইন্টারনেট, পরে আবার দাম বৃদ্ধি
জিওর বাজারে প্রবেশের পর সাধারণ গ্রাহকেরা দীর্ঘদিন কম দামে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু বাজারে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে আসার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন দেখা দেয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জিও বিভিন্ন প্যাকেজ ও সেবার দাম প্রায় ১২ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ায়। অন্য অপারেটররাও পরে নিজেদের সেবার মূল্য বাড়ায়।
অর্থাৎ, শুরুতে বিনা মূল্যে ও কম দামে ইন্টারনেট দেওয়ার মাধ্যমে গ্রাহক বাড়ানোর যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, বাজারের কাঠামো পরিবর্তনের পর সেই সুবিধা আগের মতো থাকেনি।
জিওর শেয়ারবাজারে জমা দেওয়া নথিতেও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে সেবার মূল্য বাড়ালেই যে আয় একই হারে বাড়বে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ দাম বেড়ে গেলে গ্রাহকেরা কম মূল্যের প্যাকেজ নিতে পারেন অথবা অন্য অপারেটরে চলে যেতে পারেন।
এবার স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের বাজারেও নজর
টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি এবার মহাকাশভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবসায় প্রবেশের পরিকল্পনা করছে জিও। প্রতিষ্ঠানটি নিম্ন কক্ষপথের কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইলন মাস্কের স্টারলিংকের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
স্টারলিংক দীর্ঘদিন ধরে ভারতে ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, ভারতের বাজারে স্টারলিংকের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং আম্বানির প্রতিষ্ঠানের সুবিধা রক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি সরাসরি আম্বানিকে উদ্দেশ করে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কখনো প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে স্বাগত জানানো ভারতের বাজারেই তাদের ব্যবসার বিকাশ ঘটেছে।
জিওর পরবর্তী লক্ষ্য কত দূর?
বিনা মূল্যের ইন্টারনেট দিয়ে যাত্রা শুরু করে এক দশকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে জিও। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ১৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং গ্রাহকসংখ্যা ৫৩ কোটির বেশি।
তবে সামনে প্রতিষ্ঠানটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। টেলিযোগাযোগ বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা, গ্রাহক ধরে রাখা, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মতো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।
জিওর উত্থান ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া এবং গ্রাহকদের জন্য ভবিষ্যতে সেবার মূল্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

