ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে থেকে অনলাইনে কেনা পণ্য সরাসরি ক্রেতার কাছে পাঠাতে এখন থেকে বাড়তি খরচ গুনতে হবে বিক্রেতা ও আমদানিকারকদের। রোববার (১ নভেম্বর) থেকে এসব পার্সেলের ওপর নতুন ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি কার্যকর করেছে ইইউ। পণ্যের দাম কত, তার ওপর এই ফি নির্ভর করবে না। এর আগে জুলাইয়ে চালু হওয়া ৩ ইউরো শুল্কের সঙ্গে নতুন এই ফি যুক্ত হওয়ায় চীনসহ ইইউর বাইরের দেশগুলোর অনলাইন বিক্রেতাদের জন্য ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠানো আরও ব্যয়বহুল হলো।
নতুন নিয়মে প্রতিটি পার্সেলের জন্য একবার ২ ইউরো করে দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং একটি পার্সেলে কত ধরনের পণ্য রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করবে মোট ফি। শুল্ক ঘোষণায় আলাদা পণ্যশ্রেণি হিসেবে গণ্য হলে প্রতিটির জন্য ২ ইউরো দিতে হবে। একই ধরনের একাধিক পণ্য থাকলে সেগুলোকে একটি শ্রেণি হিসেবেই বিবেচনা করা হবে।
ধরা যাক, কেউ একটি পার্সেলে ১০টি একই ধরনের টি শার্ট কিনলেন। সে ক্ষেত্রে হ্যান্ডলিং ফি হবে ২ ইউরো। কিন্তু একই পার্সেলে টি শার্টের পাশাপাশি টুপিও থাকলে দুটি আলাদা পণ্যশ্রেণি হিসেবে গণ্য হবে। তখন ফি দিতে হবে ৪ ইউরো। অর্থাৎ পণ্যের সংখ্যা নয়, মূলত পণ্যের শ্রেণিই এখানে খরচ নির্ধারণের বিষয়।
তবে নতুন ফি আর জুলাইয়ে চালু হওয়া শুল্ক এক নয়। গত ১ জুলাই থেকে ১৫০ ইউরো বা তার কম মূল্যের পার্সেলে থাকা প্রতিটি আলাদা পণ্যশ্রেণির ওপর ৩ ইউরো অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছে ইইউ। নতুন ২ ইউরো ফি এর অতিরিক্ত। ফলে ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের একটি পার্সেলে দুটি আলাদা পণ্যশ্রেণি থাকলে দুই ধরনের চার্জ মিলিয়ে মোট ১০ ইউরো দিতে হবে। অন্যদিকে, ১৫০ ইউরোর বেশি মূল্যের পার্সেল নতুন হ্যান্ডলিং ফির আওতায় থাকলেও সেগুলোর ক্ষেত্রে ৩ ইউরোর নির্দিষ্ট শুল্কের পরিবর্তে পণ্যের প্রচলিত শুল্কহার প্রযোজ্য হবে।
এর পেছনে রয়েছে অনলাইন কেনাকাটার দ্রুত বিস্তার এবং শুল্ক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তে থাকা চাপ। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ছোট প্যাকেজ প্রবেশ করেছে। এর আগের বছর ১৫০ ইউরোর কম মূল্যের ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ই-কমার্স পার্সেল আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ এসেছিল চীন থেকে। আলিএক্সপ্রেস ও টেমুর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আসা এসব পণ্যের বড় অংশই সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যায়।
সমস্যাটি শুধু পার্সেলের সংখ্যা নয়, এসব পণ্যের নিরাপত্তা ও মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। খেলনা, ইলেকট্রনিকস, প্রসাধনী থেকে শুরু করে পোশাকের মতো পণ্যের অনেকগুলোই ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা ও মানদণ্ড পূরণ করে না। কোনো পণ্য বাজারে পৌঁছানোর আগে সেটি পরীক্ষা করা এবং নিয়ম মেনে আমদানি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুল্ক কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বিপুলসংখ্যক ছোট পার্সেল আসতে থাকায় প্রতিটি পণ্য যথাযথভাবে পরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কমিশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে আমদানি হওয়া প্রতি ১০ লাখ পণ্যের বিপরীতে শুল্ক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে মাত্র ৬৫টি। অর্থাৎ পণ্যের প্রবাহ যত দ্রুত বাড়ছে, সেই তুলনায় নজরদারি বাড়ানো যাচ্ছে না।
ইইউর নতুন ফি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য এই বাড়তি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের একটি অংশ জোগাড় করা। পণ্যের তথ্য যাচাই, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, শুল্ক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পরিচালনায় যে অর্থ খরচ হয়, তা মেটাতে এই ফি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি ইউরোপের নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও সমতা আনতে চায় জোটটি। কারণ, ইইউর ভেতরের বিক্রেতাদের স্থানীয় কর, শুল্ক ও পণ্যের নিরাপত্তাবিধি মেনে ব্যবসা করতে হয়। অথচ বাইরের দেশ থেকে আসা বিপুলসংখ্যক ছোট পার্সেলের ক্ষেত্রে এত দিন একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা কঠিন ছিল।
ইইউর নিয়ম অনুযায়ী, নতুন হ্যান্ডলিং ফি সরাসরি ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করার জন্য তৈরি করা হয়নি। পণ্য আমদানি ও শুল্ক ঘোষণার দায়িত্বে থাকা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে এই অর্থ দিতে হবে। তবে বিক্রেতা, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিংবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে পণ্যের দামের সঙ্গে এই খরচ যুক্ত করতে পারে। ফলে সরাসরি ক্রেতার ওপর ফি আরোপ না করলেও বাস্তবে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ভোক্তা অধিকার সংস্থা বিইইউসি। সংস্থাটির মতে, নতুন ফি শুল্ক কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কেনাকাটার একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ক্রেতার বিলের সঙ্গে বাড়তি খরচ যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। ইইউর ভোক্তা অধিকারবিষয়ক নিয়ম অনুযায়ী, কেনাকাটা সম্পন্ন করার আগেই ক্রেতাকে কর ও অন্যান্য চার্জসহ পণ্যের মোট মূল্য জানাতে হবে। অর্থাৎ কোনো অতিরিক্ত খরচ আগে থেকে না জানিয়ে শেষ মুহূর্তে যুক্ত করা যাবে না।
নতুন ২ ইউরো হ্যান্ডলিং ফি ইইউর বৃহত্তর শুল্ক সংস্কারের অংশ। এটি শুধু সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে চালু করা হয়নি। তবে এর পরিমাণ নির্ধারণে শুল্ক ব্যবস্থাপনার প্রকৃত ব্যয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রতি দুই বছর পরপর ইউরোপীয় কমিশন এই ফি পরিচালনার আনুমানিক ব্যয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেবে।
অন্যদিকে, জুলাইয়ে চালু হওয়া ৩ ইউরো অস্থায়ী শুল্ক ২০২৮ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। এরপর ইইউর নতুন কাস্টমস ডেটা হাব চালু হলে পণ্যের ধরন অনুযায়ী প্রচলিত শুল্কহার কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যের তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই ও শুল্ক নির্ধারণের ব্যবস্থা আরও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ছোট পার্সেলের ওপর নতুন ফি আরোপকে শুধু অনলাইন কেনাকাটার খরচ বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে ইইউ একদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা ই-কমার্স আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, অন্যদিকে পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিজস্ব ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলক সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। তবে এই বাড়তি ব্যয়ের কতটা শেষ পর্যন্ত ইউরোপের ভোক্তাদের পণ্যের দামে গিয়ে যুক্ত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

