ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার গোঙ্কুর জিতেছেন এমন একজন লেখক, যিনি নিজের বই লেখার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তা নিয়েছেন। ৬২ বছর বয়সী ফিলিপ জেনাদা মঙ্গলবার তাঁর উপন্যাস ‘ল্যাঁকোন্যু দু ক্য দ্য জাভেল’ (জাভেল ঘাটের অচেনা নারী)-এর জন্য প্রিঁ গঙ্কুর পুরস্কার অর্জন করেন। বইটিতে যুদ্ধ-পরবর্তী প্যারিসে এক তরুণীর অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত তুলে ধরা হয়েছে।
তবে জেনাদার এই বিজয় শুধু সাহিত্যিক অর্জনের কারণে আলোচনায় আসেনি। বই লেখার কাজে চ্যাটজিপিটি ও ক্লডের মতো এআই টুল ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করায় ফ্রান্সের প্রকাশনা জগতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গোঙ্কুর একাডেমি পুরস্কারের নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও জানিয়েছে।
চলতি বছর গোঙ্কুর পুরস্কার এমনিতেই এআই-সংক্রান্ত বিতর্কে জড়িয়েছিল। কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি লেখা ব্যবহারের অভিযোগে পুরস্কারের অন্যতম সম্ভাব্য বিজয়ী হাইতি বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক থেলিসন ওরেলিয়েনকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে জেনাদা নিজেকে পুরোনো ধাঁচের লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। এমনকি তাঁর নিজের কোনো মুঠোফোনও নেই। তা সত্ত্বেও গবেষণার কাজে এআইয়ের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
লেখায় এআই ব্যবহার নিয়ে জেনাদার যুক্তি
পুরস্কার পাওয়ার আগেই লেখালেখিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন জেনাদা। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক কি বিশেষ দৃশ্য নির্মাণে প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি গোপন রাখেন?
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘২০ মিনিটস’কে তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই আমরা আর কোনো লেখাকে শতভাগ মানুষের লেখা বলে দাবি করতে পারব না। এমন একটি উপন্যাসের কথাও সহজেই কল্পনা করা যায়, যার একটি অধ্যায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকবে যে সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে লেখা হয়েছে।”
তবে সাহিত্য সৃষ্টিতে মানুষের আবেগ ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বের বিষয়ে তিনি আপসহীন। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের হৃদয়, আত্মা, স্মৃতি কিংবা পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প হতে পারে না।
জেনাদা বলেন, “সংজ্ঞা অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো মানুষ হতে পারবে না। এটি কখনো মানুষের হৃদয়, আত্মা, স্মৃতি এবং মানুষ ও পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একটি বই লিখতে পারবে না।”
এআই বিতর্কে বাদ পড়েছিলেন আরেক লেখক
জেনাদার পুরস্কার জয় এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এআই ব্যবহারের অভিযোগে আরেক লেখকের বই গোঙ্কুর প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
হাইতি বংশোদ্ভূত কানাডীয় লেখক থেলিসন ওরেলিয়েনের ‘সেতে সা উ মুরির’ (হয় এমন, নয়তো মৃত্যু) বইটি প্রথমদিকে পুরস্কার জয়ের অন্যতম সম্ভাব্য দাবিদার ছিল। কিন্তু এআই ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর বইটি গোঙ্কুর পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। অন্যান্য সাহিত্য পুরস্কারের প্রতিযোগিতা থেকেও বইটি বাদ পড়ে।
একটি এআই শনাক্তকারী ব্যবস্থায় পরীক্ষা করে দাবি করা হয়, বইটির ৯৫ শতাংশের বেশি লেখা যন্ত্রের মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের শনাক্তকারী প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
ওরেলিয়েন তাঁর উপন্যাস লেখার কাজে এআই ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে আগের কিছু লেখায় অন্যের লেখা নকল করার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছিলেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের প্রকাশনা ও সাহিত্য অঙ্গনে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
গোঙ্কুর পুরস্কারের নিয়ম বদলাচ্ছে একাডেমি
বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে গোঙ্কুর একাডেমি পুরস্কারের বিধিমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন নিয়মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি সাহিত্যকর্মকে প্রতিযোগিতার বাইরে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
একাডেমির সভাপতি ফিলিপ ক্লোদেল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা নিয়ম পরিবর্তন করতে যাচ্ছি। বছরের শেষ নাগাদ নতুন নিয়ম গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে গোঙ্কুর পুরস্কারের বিধিমালায় স্পষ্ট করা হবে, এই পুরস্কার কেবল মানুষের লেখা সাহিত্যকর্মকেই সম্মানিত করবে।”
প্রকাশনা সংস্থা গ্যালিমারের প্রধান আন্তোয়ান গ্যালিমারও লেখালেখিতে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, আপনি যখন একটি বই তৈরি করেন এবং তাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, তখন বিষয়টি খুব সহজভাবে ও সততার সঙ্গে প্রকাশ করা উচিত।”
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত থেকে পুরস্কার
প্যারিসের লে দ্রুয়াঁ রেস্তোরাঁর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জেনাদা বলেন, “আমার কাছে এটি একটি দীর্ঘ পথচলার পরিণতি। এটি আমার জন্য সম্মানের। আমি ভীষণ আনন্দিত।”
এই রেস্তোরাঁতেই প্রতিবছর গোঙ্কুর পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
অমীমাংসিত অপরাধের তদন্ত নিয়ে লেখার জন্য পরিচিত জেনাদা। তাঁর বইয়ে পুরোনো নথিপত্রের তথ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা ও স্মৃতিরও প্রতিফলন থাকে।
পুরস্কার জয়ের পর ব্যস্ত সময় কাটানোর প্রত্যাশা করলেও তিনি আবার লেখকের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। সেই জীবনে আদালতের নথিপত্র ঘেঁটে অপরাধের রহস্য অনুসন্ধান করাই তাঁর প্রধান কাজ।
এবারের পুরস্কারে একাডেমির নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জন জেনাদার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বাকি তিনটি ভোট পেয়েছেন সিলভাঁ প্রুদম। তাঁর ‘দ্য লোত্র কোতে দ্যু লাক’ (হ্রদের অন্য পাড়ে) উপন্যাসে একজন তরুণ আলোকচিত্রীর গল্প তুলে ধরা হয়েছে। গল্পে ওই আলোকচিত্রী উঁচু পাহাড়ের একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকায় ঘুরে বেড়ান।
জেনাদার পুরস্কারজয়ী উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে লুইজ কানসো নামের এক তরুণীর হত্যাকাণ্ড। তাঁর বয়স ছিল ২৯ বছর। ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলের বাসিন্দা কানসো পরে প্যারিসে এসে মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বরে সেইন নদীর তীরে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
হত্যাকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করতে গিয়ে জেনাদা বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র কমিশনার জুল মেগ্রের তদন্তপদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। জুল মেগ্র হলো লেখক জর্জ সিমেনঁর জনপ্রিয় গোয়েন্দা উপন্যাসের চরিত্র।
এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনুসন্ধানে জেনাদা পুলিশের পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটেছেন। পাশাপাশি নিহত নারী জীবনের বিভিন্ন সময়ে যেসব স্থানে বসবাস করেছিলেন, সেসব জায়গাও ঘুরে দেখেছেন।
ফরাসি সংবাদপত্র ‘ল্য মোঁদ’ বইটি সম্পর্কে লিখেছে, “ফিলিপ জেনাদার অন্য সব উপন্যাসের মতো এই বইটিও সময়ের প্রবাহ নিয়ে গভীরভাবে কথা বলেছে। এতে কয়েক দশক ধরে কী টিকে থাকে আর কী হারিয়ে যায়, তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে।”
এবারের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আরও দুটি বই ছিল। একটি ক্লেমন্তিন মেলোয়ার ‘শোজ ক্য জ্য ক্রোয়া পেদ্যু’ (যেসব জিনিস হারিয়ে গেছে বলে ভেবেছিলাম)। অন্যটি ইয়ানিক আনেলের ‘লা সোলিতুদ দে প্রফেসরের এ আঁফিনি’ (শিক্ষকদের নিঃসঙ্গতার কোনো শেষ নেই)।
গোঙ্কুর পুরস্কারের আর্থিক মূল্য মাত্র ১০ ইউরো বা ৯ পাউন্ড। কিন্তু এর স্বীকৃতি একজন লেখকের সাহিত্যিক পরিচিতি ও বইয়ের বিক্রিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
গত বছরের বিজয়ী লরাঁ মোভিনিয়ের উপন্যাস ‘লা মেজোঁ ভিদ’ (খালি বাড়ি) প্রায় ছয় লাখ ৪০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল। ফলে জেনাদার ক্ষেত্রেও পুরস্কারটি তাঁর বইয়ের পাঠকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক সাফল্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

