মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে ইরান। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের কারণে এই জলপথে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের বাণিজ্যিক জাহাজকে চলাচলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়েছে তেহরান। বিষয়টি শুধু চার দেশের জাহাজ চলাচলের সুবিধা নয়; বরং যুদ্ধের মধ্যে ইরান কীভাবে নিজের কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে, তারও একটি ইঙ্গিত।
স্থানীয় সময় (৩ নভেম্বর) ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোগাদ্দাম ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চার দেশের জাহাজকে ছাড় দেওয়ার কথা জানান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের আরোপিত বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি পাচ্ছে। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের পারস্পরিক স্বার্থ কাজ করছে।
ভারত ও চীনকে ছাড় দেওয়ার পেছনে কী হিসাব?

ইরানের এই সিদ্ধান্তে ভারতের অন্তর্ভুক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশটির অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি আমদানি হয়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, আমদানি ব্যয় এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
মোগাদ্দামের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় জাহাজকে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পেছনে ইরানের একটি বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। ভারত থেকে ওষুধ ও ওষুধজাত পণ্য আমদানি করতে চায় তেহরান। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে ইরানের আমদানি ব্যবস্থা চাপে থাকায় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সচল রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ভারতকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি শুধু বন্ধুত্বের প্রকাশ নয়; এর সঙ্গে ইরানের নিজস্ব সরবরাহ ও চিকিৎসা খাতের প্রয়োজনও যুক্ত।
তবে ছাড় পাওয়ার অর্থ ভারতীয় জাহাজ বিনা খরচে প্রণালি পার হবে, এমন নয়। মোগাদ্দামের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় ও চীনা জাহাজের কাছ থেকে পারাপারের ফি নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে ফি নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
এখানে ইরানের একটি বড় কৌশল দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক যখন সংঘাতপূর্ণ, তখন চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার অবস্থানেরও আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
ইরাক ও কাতারকে ছাড় দেওয়ার তাৎপর্য
ইরাকের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক শুধু প্রতিবেশীসুলভ বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশ দুটির মধ্যে গভীর রাজনৈতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক রয়েছে। ইরাকের জ্বালানি খাত, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে ইরাকি জাহাজকে হরমুজে চলাচলের সুযোগ দেওয়া তেহরানের আঞ্চলিক সম্পর্ক ধরে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা যায়।
অন্যদিকে কাতারের বিষয়টি কিছুটা আলাদা। কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক। দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি রপ্তানি হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই জলপথ বন্ধ বা অনিরাপদ হয়ে পড়লে কাতারের অর্থনীতিও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। ইরান ও কাতারের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রগুলোর একটি যৌথভাবে অবস্থিত। ইরানের অংশটি দক্ষিণ পার্স এবং কাতারের অংশটি নর্থ ডোম নামে পরিচিত। দুই দেশের মধ্যে এই জ্বালানি সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
কাতারের জাহাজকে বিনা ফিতে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও স্বার্থের ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে কাতার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখে।
হরমুজ কেন ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ার?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যেরও উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে হরমুজে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে শুধু উপসাগরীয় দেশগুলো নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিও চাপে পড়ে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলো এই পথের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এই জলপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। দেশটির দীর্ঘ উপকূলরেখা, নৌবাহিনীর উপস্থিতি, উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামুদ্রিক নজরদারি সক্ষমতা হরমুজকে কেন্দ্র করে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ করে দেয়।
এখানেই ইরানের বর্তমান কৌশলের গুরুত্ব। সব দেশের জাহাজের জন্য একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ না করে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের জন্য ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, তেহরান হরমুজকে শুধু সামরিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং কূটনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছে।

ট্রাম্পের নির্বাচনী ধাক্কার পর ইরানের বার্তা কী?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ধাক্কা এবং ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে যাওয়ার খবরের পরপরই ইরানের এই সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। সময়ের এই মিল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নির্বাচনী ফলাফলের কারণেই ইরান চার দেশকে ছাড় দিয়েছে, এমনটা নয়।
তবে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ইরানের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি কংগ্রেসে বিরোধী দলের চাপের মুখে পড়ে, তাহলে ইরানকে ঘিরে সামরিক ও কূটনৈতিক নীতিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম, সামরিক ব্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মার্কিন ভোটারদের উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠলে হোয়াইট হাউসের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
ইরান সম্ভবত এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না রেখে ভারত ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে চার দেশের জাহাজকে ছাড় দিয়ে তেহরান দেখাতে চাইছে, হরমুজে চলাচলের সুযোগ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মোগাদ্দাম দাবি করেছেন, চার দেশের জাহাজ চলাচলে মার্কিন বাহিনীও বাধা দিচ্ছে না দিলেও ইরানের এই ছাড়কে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমন্বিত চুক্তির ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন বিভাজনের আশঙ্কা
ইরানের এই সিদ্ধান্তের একটি বড় আন্তর্জাতিক তাৎপর্য রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সুযোগ যদি দেশের জাতীয়তা ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
কারণ আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের মূল ভিত্তি হলো নিরাপদ ও বৈষম্যহীন চলাচল। কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রণালিতে নির্দিষ্ট দেশের জাহাজকে সুবিধা এবং অন্য দেশের জাহাজকে বাধার মুখে পড়তে হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠবে।
এতে জাহাজের বীমা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
চার দেশের জন্য হরমুজ প্রণালিতে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইরানের একটি নির্বাচিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখা যায়। ভারত থেকে ওষুধ আমদানি, চীনের রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা, ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কাতারের সঙ্গে জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষা ক্ষেত্রেই তেহরানের নিজস্ব হিসাব রয়েছে।
তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, ইরান দেখাতে চাইছে যে, হরমুজ প্রণালিতে তার প্রভাব শুধু সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই জলপথ দিয়ে কারা চলাচল করতে পারবে, সেই প্রশ্নকেও তারা আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির অংশ করতে চাইছে। ফলে হরমুজ এখন শুধু তেল পরিবহনের পথ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, কূটনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য ইকোনমিক টাইমস এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)

