শিশু যৌন নির্যাতন বন্ধ করুন
ভারতে নাবালকদের মধ্যে যৌন অপরাধের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন শিশু অধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা। সর্বশেষ উত্তর প্রদেশের এক ঘটনায় ১২ বছরের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে একই বয়সী পাঁচ ছাত্রের বিরুদ্ধে। ওই ছাত্রী দলিত সম্প্রদায়ের বলে জানিয়েছে পুলিশ এবং অভিযুক্তরাও একই পটভূমির।
পুলিশ জানায়, ঘটনাটি ঘটে ৮ মে, যখন ভুক্তভোগী এক মাঠে খেলছিল। অভিযুক্তরা তাকে মাদক মিশ্রিত কোমল পানীয় খাইয়ে কাছাকাছি একটি স্কুলে নিয়ে যায় এবং সেখানে ধর্ষণ করে। শুধু তাই নয়, তারা পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয়।
এই ঘটনা একমাত্র নয়। চলতি মাসেই উত্তর প্রদেশ, কর্ণাটক ও চেন্নাইসহ একাধিক স্থানে নাবালকদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ উঠে এসেছে। চেন্নাইয়ের ঘটনায় ১৩ বছরের এক অন্তঃসত্ত্বা কন্যার চিকিৎসার সময় প্রকাশ পায়, তাকে ধর্ষণ করেছে ১২ জন- যাদের মধ্যে ছয়জন নাবালক।

জাতীয় পরিসংখ্যানও চিন্তার কারণ-
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া যৌন অপরাধের অভিযোগ ছিল ৫,৩৫২টি। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ১,১৩০টি এবং যৌন হয়রানির মামলা ৮৭৪টি। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী অভিযুক্তদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী অপরাধীরাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের এক কর্মকর্তা।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সমস্যার মূল কারণ-
শিশু অধিকারকর্মী প্রশান্ত কুমার দুবে এবং অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ মনে করেন, এই প্রবণতার পেছনে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার, যৌন কনটেন্টে অল্প বয়সে প্রবেশাধিকার, অভিভাবকদের নজরদারির অভাব এবং বিকৃত সামাজিক মানসিকতা দায়ী।
দুবে বলেন, অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল হাতে পেলেও শিশুদের বয়সোপযোগী ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানো হয়নি। অনেক বাবা-মা ‘প্যারেন্টাল লক’ ব্যবহার করতেও জানেন না।
অধ্যাপিকা ঘোষ যোগ করেন, আমরা মেয়েদের আত্মরক্ষা শেখাতে বলি কিন্তু ছেলেদের শেখাই না কীভাবে সম্মান করতে হয়। এটা চিন্তার বড় কারণ।

সমাধানে সচেতনতা ও পারিবারিক ভূমিকার ওপর জোর-
বিশেষজ্ঞ সত্যগোপাল দে বলেন, সমস্যার মূলে না গিয়ে আমরা শুধু উপসর্গে ওষুধ দিচ্ছি। শিশুদের সঙ্গে তাদের বয়সের উপযোগী যৌনতা ও সম্পর্ক বিষয়ক আলাপ করতে হবে। ছেলেদেরও শেখাতে হবে নারীদের প্রতি সম্মান ও সংবেদনশীলতা।
তিনি আরো বলেন, নাবালকরা কী দেখছে, কী খেলছে, সেটাও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এমনকি ঘরোয়া সহিংসতার অভিজ্ঞতাও তাদের মানসিক বিকৃতি তৈরি করতে পারে।
প্যারেন্টিং কনসালটেন্ট পায়েল ঘোষ বলেন, অভিভাবকদের জাজমেন্টাল না হয়ে সন্তানের অনুভূতি ও প্রশ্ন শোনার মতো জায়গা তৈরি করতে হবে। সন্তানের মনোভাব ও আচরণের পরিবর্তন বুঝে তার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।
ভারতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যৌন অপরাধ বাড়ছে, যা কেবল সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও এক গুরুতর সংকেত। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, পরিবারভিত্তিক নজরদারি ও বয়সোপযোগী যৌনশিক্ষার গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

