চীনের বহু থিঙ্ক ট্যাংক এবং রাজনৈতিক, গোয়েন্দা, নিরাপত্তা ও সামরিক মহল মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে এবং সেখানে চীনের স্বার্থ ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দূর করতে জরুরি সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়নের চেষ্টা করছে। বিশেষ করে, এই অঞ্চলের একাধিক মার্কিন ঘাঁটি থেকে চীনের আঞ্চলিক মিত্র ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, যা বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটি থেকে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে, চীন হয়তো আঞ্চলিক দেশগুলোকে চাপ প্রয়োগে সহায়তা করবে যাতে তারা মার্কিন বাহিনী বিতাড়িত করে, যেখানে ইরান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করবে। চীনের দৃষ্টিতে, এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা ঘাঁটিগুলো তাদের বাড়তে থাকা প্রভাবের প্রধান বাধা।
এই লক্ষ্যে চীন একটি বৃহৎ সামরিক পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগর থেকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ধ্বংস বা অপসারণের প্রক্রিয়ায় ইরানি বাহিনী, চীন ও রাশিয়ার পরোক্ষ সহায়তায়, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত রয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, সিরিয়ার দেইর আল-জোর প্রদেশের আলবুকামালে অবস্থিত ইরানি সামরিক ঘাঁটি ‘ইমাম আলী’ থেকে মার্কিন উপস্থিতিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
চীন আত্মবিশ্বাসী যে মিশরের সেনাবাহিনীও এই পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারবে। মিশর একমাত্র আরব দেশ যেখানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই এবং এটি আফ্রিকার মূল প্রবেশদ্বার। চীন ভবিষ্যতে ইউএস আফ্রিকম (USAFRICOM) নির্মূলেও সহায়তা করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীনে ৫৩টি আফ্রিকান দেশে সামরিক সম্পর্ক ও কার্যক্রম পরিচালনা করে; মিশর এর আওতাভুক্ত নয়, বরং সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) অন্তর্ভুক্ত।
এই প্রেক্ষিতে, চীন, ইরান ও মিশরের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক চলাচল এবং ইসরায়েলের একমাত্র মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ওপর নজর রাখছে। ওই ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী দেশগুলো, বিশেষত মিশর ও চীন-রাশিয়ার সামরিক যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করে। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মিশর-চীন যৌথ সামরিক মহড়া ‘সিভিলাইজেশন ঈগল’-এর ওপরও এই ঘাঁটি থেকে নজরদারি চালানো হয়। ইসরায়েলি ও মার্কিন গোয়েন্দা মহল এই মহড়াকে অবিশ্বাস ও সতর্কতার চোখে দেখেছে। তাদের ধারণা, চীন এই মহড়ার মাধ্যমে বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা মিশরসহ আঞ্চলিক মিত্রদের রক্ষা করবে যদি ওয়াশিংটন ও তেলআবিব তাদের ওপর কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ করে। এই মহড়া সরাসরি বার্তা দিয়েছে- চীন মিশর, তার নেতৃত্ব, জনগণ ও সেনাবাহিনীর পাশে থাকবে যদি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের মিশরের সীমানা বা সিনাইয়ে জোরপূর্বক স্থানান্তরের চেষ্টা হয়। এই কারণে, ইসরায়েলের কেরেন পর্বতে অবস্থিত মার্কিন AN/TPY-2 রাডার ঘাঁটি চীন-মিশরের সব সামরিক পদক্ষেপ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
চীন মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং মিশরের সেনাবাহিনীকে সামরিকভাবে সহায়তা দিচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপে গাজাবাসীদের সিনাই বা সীমান্তে স্থানান্তরের চাপ মোকাবিলা করা যায়। এই প্রেক্ষিতে, চীনের সামরিক গোয়েন্দা মহল ইসরায়েল-মিশর সীমান্তে উত্তেজনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছে, যেখানে মিশর সামরিকভাবে নজিরবিহীনভাবে সিনাইয়ে মোতায়েন বাড়িয়েছে। চীন-মিশরীয় যৌথ মহড়ার সময়ই এই মোতায়েন ঘটে, যা তেলআবিবকে উদ্বিগ্ন করেছে। ইসরায়েল মনে করে এটি ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির লঙ্ঘন। গাজায় ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে মিশর-ইসরায়েল সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটছে।
এই মার্কিন অভিযানের পাল্টা হিসেবে, চীন এখন তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরেও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে চীন ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর এবং আরব উপসাগরে সামরিক ও নৌঘাঁটি স্থাপন করতে চায়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় তারা। পিপলস লিবারেশন আর্মি এবং চীনা নৌবাহিনী উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে সঙ্কটময় সময়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বড় আকারের সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে।
বর্তমানে চীনের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা নেই মার্কিন ঘাঁটি সরাসরি হটানোর। তবে, চীন বিভিন্ন সামরিক কৌশলের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বিস্তারের পথ তৈরি করছে- যেমন সামরিক ওভারফ্লাইটের অনুমতি, যৌথ মহড়া, অস্ত্র বিক্রি, জাহাজের রসদ সরবরাহ এবং ছোট সামরিক স্থাপনা পরিচালনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন এই কৌশলগুলো অবলম্বন করছে যাতে ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করা যায়। একইসঙ্গে চীন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, বিশেষ করে অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পে, অঞ্চলজুড়ে প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট। কূটনৈতিকভাবেও তারা আঞ্চলিক সংকট সমাধানে নেতৃত্ব নিতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আংশিক প্রস্থানের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থানকে চীন কৌশলগতভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, চীন উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের জোট মানচিত্রে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে, যেখানে কিছু দেশ মার্কিন প্রভাব কমে যাওয়ায় বিকল্প অংশীদার খুঁজছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে চীন তার মিত্র ইরানকে সহায়তা দিচ্ছে। ইসরায়েল ও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর, ইরানি রেভোলিউশনারি গার্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চীনের পরোক্ষ সহায়তায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করে দেবে। ২০২৫ সালের ২৩ জুন, ইরান কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি এবং ইরাকের একাধিক মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। কাতার জানিয়েছে, তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এই “বাশায়ের আল-ফাতাহ অভিযান” ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের দ্বিতীয় বড় হামলা। এর আগে “শহীদ সোলাইমানি অভিযান” চালানো হয়েছিল। এর এক সপ্তাহ আগে, যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে ইরান ইরবিলে মার্কিন কনস্যুলেটেও হামলা চালায়।
ইসরায়েলি হামলার পূর্বে, চীনের সহায়তায় ইরানি সামরিক কর্মকর্তারা হুমকি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা করে, তবে তারা ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানবে। তেহরান একইসঙ্গে ঘোষণা করে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ নৌঘাঁটিতেও পাল্টা হামলা চালাবে।
এই উত্তেজনার প্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, কুয়েত এবং বাহরাইনে তাদের দূতাবাস থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে নেয়। এই পদক্ষেপ ইরানের হুমকির প্রেক্ষিতে আসে- যেখানে তেহরান বলে, যদি সংঘাত শুরু হয়, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করবে। চীন এই হুমকিকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো অপসারণে বৃহৎ সামরিক পরিকল্পনা করছে, যাতে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব খর্ব হয় এবং চীনের স্বার্থ ও প্রভাব সংরক্ষিত থাকে।

