গত মাসে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ যখন সতর্ক করে বলেছিলেন যে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, না হলে “সবার পালা আসবে”, তখন তা ছিল কেবল একটি কূটনৈতিক হতাশা নয় বরং একটি সাংকেতিক এসওএস বার্তা।
গত মাসে ইসরায়েল যখন ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, আর পশ্চিমা নেতারা ও গণমাধ্যম যখন বাস্তবতাকে উল্টোভাবে উপস্থাপন করে ইরানকেই হুমকি বলে ঘোষণা দেয়, তখন এক ভয়ঙ্কর প্রশ্ন মাথাচাড়া দেয়: এবার কার পালা?
এটিকে আপনি ভীতি-প্রসূত কল্পনা ভাবতেই পারেন। কিন্তু “বিশ্ব নিরাপত্তার” নামে দেশগুলোকে কলঙ্কিত, অকার্যকর ও ধ্বংস করে দেওয়ার দশকের পর দশক ধরে চলা ধারা পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট: এটি এখন আর উপেক্ষা করা যায় না।
পশ্চিমা বিশ্ব এখন আর ট্যাংক বা জাতিসংঘের প্রস্তাবের প্রয়োজন অনুভব করে না। কৌশল পাল্টেছে। আজ সার্বভৌমত্ব ধ্বংস হয় শিরোনামে, অর্থনৈতিক শ্বাসরোধে ও বিবরণী-ভিত্তিক যুদ্ধে। যদি তাও ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসরায়েলের মঙ্গল রক্ষাই হয়ে ওঠে আগাম হামলার যথেষ্ট কারণ।
এই বিষয়ে একবার হলেও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে কৃতিত্ব দেওয়া যেতে পারে: তিনি অনেক সময় “নীরব অংশটিই জোরে” বলেন। কয়েক দশক ধরে তিনি মুসলিম “দুর্বৃত্ত” শাসকদের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের বিষয়ে হুঁশিয়ার করে আসছেন। ইরাক বোমায় আক্রান্ত হয়েছে, লিবিয়া নিরস্ত্র হয়েছে, ইরানকে শ্বাসরোধ করা হচ্ছে।
আর পাকিস্তান? এটি শেষ সীমান্ত- কারণ নয় যে দেশটি কাউকে আক্রমণ করেছে বরং কারণ এটি পশ্চিমা ও জায়নবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে কৌশলগত, আদর্শগত ও প্রযুক্তিগত প্রতিবাদের প্রতীক।
এই যুক্তি ক্রমে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেছে, যেখানে বলা হয়েছে পাকিস্তান এমন আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম। নিশ্চিত করার প্রয়োজন নেই; ইঙ্গিতমাত্রই সন্দেহ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।
ফাঁপা বয়ান-
এটি ২০০১ সাল নয়। এখন আর ঝাপসা স্যাটেলাইট ছবিতে “বিপুল বিধ্বংসী অস্ত্রের” গল্প বিক্রি হচ্ছে না। কিন্তু লক্ষ্য একই রয়ে গেছে: পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা।
ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ও নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্ক ট্যাংকগুলো এখন নিয়মিতভাবে পাকিস্তানকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করছে- যা উগ্রবাদের প্রতি সংবেদনশীল এবং পারমাণবিক উত্তেজনায় অল্পেই বিস্ফোরিত হতে পারে।
সম্প্রতি ডেইলি মেইল একটি পুরোনো কথনকেই পুনরাবৃত্তি করেছে: পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব নাকি ভারতের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে এবং তা নাকি যুক্তিবোধ নয়, বরং ধর্মান্ধতা দ্বারা চালিত। এই বিশ্লেষণ- আরেকজন ভারতীয় “নিরাপত্তা বিশ্লেষক”-এর কণ্ঠে- পাকিস্তানকে এক “চরমপন্থী ইসলামি রাষ্ট্রে” পরিণত হওয়ার পথে বলে চিত্রিত করেছে।
এই দাবি যে কতটা ফাঁপা, তা দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলেই বোঝা যায়। যত সংকটই থাকুক, পাকিস্তান গত সাত দশকের বেশি সময়ে কখনোই কোনো ধর্মভিত্তিক দলকে ক্ষমতায় নির্বাচিত করেনি। ভোটাররা একাধিকবার ধর্মতন্ত্রকে ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, ভারত বারবার ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এমন একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেছে- যিনি ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় দায়িত্বে ছিলেন অথবা কমপক্ষে চক্ষুপাত করেননি বলে বিশ্বাস করা হয়। সেই ব্যক্তি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এখন এমন একটি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন- যারা খোলাখুলিভাবে একটি হিন্দু ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে, যেখানে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করে তোলা হয়।
তবুও, ব্রিটিশ ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের বড় অংশে ভারতই থাকে “ঘরের প্রাপ্তবয়স্ক”- যুক্তিবাদী পক্ষ, গণতন্ত্রের মশাল। এই ভণ্ডামি হাস্যকর হতো, যদি না তা এতটা বিপজ্জনক হতো।
এই বছরের এপ্রিল মাসের ঘটনাই ধরা যাক, যখন পহেলগামে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর দুঃখজনক হামলার পর ভারত, পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই, সীমান্ত পেরিয়ে সামরিক অভিযান চালায়।
পশ্চিমা গণমাধ্যম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিল্লির বয়ানকে যাচাই না করেই গ্রহণ করে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের, বিপরীতে, আক্রমণাত্মক সাক্ষাৎকারের সম্মুখীন হতে হয় এবং বারবার “সন্ত্রাসবাদের ছায়া”র জন্য জবাবদিহি করতে হয়- যা একঘেয়ে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এখানে একটি নীরব কিন্তু স্পষ্ট যুক্তি কাজ করছে: হিন্দু জাতীয়তাবাদ, তা যত সহিংসই হোক না কেন, রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে বিবেচিত- হয়তো অনভিপ্রেত কিন্তু বৈধ। ইসলামপন্থী রাজনীতি, তা যতই ক্ষমতার বাইরে থাকুক, একটি অস্তিত্ববাদী হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আঞ্চলিক বৈষম্য-
এটি শুধু অলস সাংবাদিকতা নয়; এটি দায়মুক্তিকে উৎসাহ দেয়। ভারতে একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে, পশ্চিমা গণমাধ্যম একটি আঞ্চলিক বৈষম্যকে উৎসাহ দেয়- যেখানে পাকিস্তান চিরদিনের উসকানিদাতা, আর ভারত- তাদের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা সত্ত্বেও- অবাধে ছাড় পায়।
এটি শুধু ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়। এটি প্রশ্ন তোলে- দক্ষিণ এশিয়ায় কখনো শান্তি আসতে পারবে কি না, যখন একটি রাষ্ট্রের আগ্রাসনকে হালকা করে দেখা হয় আর অন্যটির অস্তিত্বকেই হুমকি হিসেবে গণ্য করা হয়। যদি গণমাধ্যম এই অঞ্চলের ভবিষ্যতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে তাদের ক্ষমতা ও পক্ষপাতদুষ্টতার চশমা খুলে ফেলতে হবে।
একটি পারমাণবিক পাকিস্তানের ধারণা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল, ভারত ও অ্যাংলো-আমেরিকান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। এখন, “মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি”-র মতো প্রকাশনাগুলো প্রকাশ্যে যা বলছে, সেটাই নীতিনির্ধারকরা গোপনে ভাবছেন: ইরানকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হলে, পরবর্তী লক্ষ্য পাকিস্তানকে নিরস্ত্র করা।
এই ধারা কেবল ভূরাজনৈতিক নয়; এটি মানসিকও। জনসাধারণকে অভ্যস্ত করে তোলা হচ্ছে এমন ধারণায়- যে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইসলামি প্রজাতন্ত্র, যার সঙ্গে চীনের কৌশলগত সম্পর্ক আছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (CPEC) মাধ্যমে, তা আর কোনও সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়—বরং বৈশ্বিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি।
এখানে কেবল পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রই নয় বরং এর “অবস্থান”ও উদ্বেগের কারণ।
ইসলামাবাদ যখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে- বিশেষ করে সিপিইসি-এর মাধ্যমে- তখন এটি পরনির্ভরতা থেকে বহুপাক্ষিক প্রতিরোধের পথে যাচ্ছে। ২১ শতকে সব পথই যেন বেইজিংয়ে গিয়ে মেলে। আমেরিকা জানে এটি, ব্রিটেন জানে এটি, ইসরায়েলও জানে এবং “নতুন সিল্ক রোড”-এ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ভূমিকাই এটিকে একটি আঞ্চলিক বিরক্তিকর থেকে এক বৈশ্বিক সন্ধিক্ষণে পরিণত করেছে।
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার পর, পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনির হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন- যা উত্তর অপেক্ষা অনেক বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি সৌজন্য? না কি সতর্কবার্তা? না কি নীতির পুনঃসমন্বয়? উত্তর যা-ই হোক, এটি পাকিস্তানের অনিশ্চিত অবস্থানকে স্পষ্ট করে দেয়: একদিকে আহ্বান জানানো হয়, আবার অবিশ্বাসও করা হয়; প্রয়োজনও হয়, আবার প্রত্যাখ্যানও।
পশ্চিমের পাকিস্তান সমস্যাটি আসলে এর কর্মকাণ্ড নয়। বরং এটি যা প্রতিনিধিত্ব করে- একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র, একটি পারমাণবিক শক্তি এবং চীনের মিত্র। আজকের বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এই তিনটির সংমিশ্রণই চূড়ান্ত “রেড লাইন”।
২০০৯ সালে, মঙ্গোল সাম্রাজ্য নিয়ে একটি স্নাতকোত্তর সেমিনারে, একজন অধ্যাপক হঠাৎ করে একটি মানচিত্র সামনে রেখে আমাকে- একজন ব্রিটিশ-পাকিস্তানিকে- জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি কি জানি পাকিস্তানকে বাল্কানাইজ করার একটি নিও-কনজারভেটিভ পরিকল্পনা রয়েছে? তিনি আমাকে উস্কাতে চাচ্ছিলেন না। তিনি জানতেন আমি পাকিস্তানি সংস্কৃতি ভালোবাসি, ক্রিকেট দল অনুসরণ করি এবং সেখানকার স্পন্দন বুঝি। সেটি ছিল একটি সতর্কবার্তা, তত্ত্ব নয়।
আজ সেই মানচিত্র আর ষড়যন্ত্র বলে মনে হয় না- বরং বাস্তবায়নাধীন একটি কৌশল।
- ফয়সাল হানিফ সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিংয়ের একজন মিডিয়া বিশ্লেষক এবং এর আগে তিনি টাইমস এবং বিবিসিতে সংবাদ প্রতিবেদক এবং গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

