নিউইয়র্কের আসন্ন মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন জোহরান মামদানি। তিনি নির্বাচিত হলে হবেন শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র। তবে তার প্রার্থিতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান। এই কারণেই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন নতুন অনেক ভোটার।
ইসরায়েলি দৈনিক জেরুজালেম পোস্ট জানায়, মামদানি ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় অনেক মার্কিন নাগরিক তাকে সমর্থন করেছেন। একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, যারা প্রথমবার ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে ভোট দিয়েছেন, তাদের ৮৩ শতাংশ মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী মনোভাবকে ভোট দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রগতিশীল গবেষণা সংস্থা ‘ডেটা ফর প্রগ্রেস’-এর এই জরিপটি প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট আন্ডারস্ট্যান্ডিং (IMEU) পলিসি প্রজেক্ট। এতে উঠে আসে, মামদানির প্রতি নতুন ভোটারদের সমর্থনের পেছনে মূল কারণ ছিল—জীবনযাত্রার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি, ধনীদের ওপর বাড়তি কর আরোপ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে তার স্পষ্ট অবস্থান।
হাজারো নতুন ভোটার মামদানির পক্ষে
নিউইয়র্কে এমন বহু নাগরিক আছেন, যারা আগে কখনো ভোট দেননি। তাদের মধ্যে কয়েক হাজার এই নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন শুধুমাত্র মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি তার সমর্থন ছিল তাদের জন্য একটি বড় কারণ।
মামদানি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি বিশ্বাস ও সমর্থন তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ইসরায়েলের গাজা অভিযানের কড়া সমালোচনা করেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে।” একইসঙ্গে তিনি জানান, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘বিডিএস’ আন্দোলনকেও তিনি সমর্থন করেন।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে ১৭০টির বেশি ফিলিস্তিনি সংস্থা এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ‘বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস (BDS)’ শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে অবৈধ দখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা।
‘নেতানিয়াহু নিউইয়র্ক এলে গ্রেপ্তার’
মামদানি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি নিউইয়র্কে আসেন, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এ বিষয়ে তার পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে বলে জানান তিনি।
‘ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিন’—এই স্লোগানের বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানানোর পর মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে তিনি কিছুটা অবস্থান পরিবর্তন করেন।
জরিপ বলছে—ইসরায়েল নিয়ে মনোভাব বদলেছে মার্কিনিদের
IMEU-এর অপর এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে। ৭৯ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে এবং ৬৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত।
এই জরিপে ৫৩১ জন ভোটার অংশ নেন। ৪ শতাংশ পর্যন্ত ত্রুটি ধরেই ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এ মাসের শুরুতে আরও এক জরিপে দেখা যায়, নিউইয়র্কের ৩০ শতাংশ ভোটার মামদানির ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থান জানার পর তার প্রতি সমর্থন জানাতে আগ্রহী হয়েছেন।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানি জয়ী হলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির দীর্ঘদিনের ‘ইসরায়েল ঘেঁষা’ অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। অনেক ডেমোক্র্যাট নেতাও গাজার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন। ইসরায়েলের সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তারা সরব হয়েছেন।
IMEU-এর নির্বাহী পরিচালক মার্গারেট দেরিউস বলেন, “আমেরিকানরা আজ যে বেদনা অনুভব করছে, তার প্রতি সহমর্মিতা দেখাতে না পারলে ডেমোক্র্যাটরা ভবিষ্যতের কোনো নির্বাচনে সফল হবে না।”
ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক প্রথাগত নেতা মামদানির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেছেন। যেমন, পেনসিলভানিয়ার ইহুদি গভর্নর জশ শাপিরো। তিনি মামদানির ফিলিস্তিনপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির নিন্দা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, শিকাগোর সাবেক মেয়র রাহাম ইমানুয়েল শুরুতে সমালোচনা করলেও পরবর্তীতে তিনিও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “নেতানিয়াহু এখন কৌশলগত, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া।” ইমানুয়েল আরও বলেন, “গাজায় কেউ ক্ষুধার্ত নেই”—নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।

