যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে চলমান বাণিজ্য আলোচনা হঠাৎ থমকে যাওয়ার পেছনে গ্লোবাল রাজনীতি ও কূটনৈতিক উত্তেজনাই মূল কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির জন্য ইতোমধ্যেই কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে, যেখানে অনেক অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও আচমকাই আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এর পেছনে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও শুল্ক নীতির জটিলতাই সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, ১ আগস্ট থেকে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
তিনি আরো সতর্ক করেছেন, শুল্কের পাশাপাশি আরো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, যার পেছনে কারণ হিসেবে তিনি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে তেল ও প্রতিরক্ষা খাতে বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন করে আরো অগ্রগতির প্রমাণ পেলে। এই ঘোষণার ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনার গতিপ্রকৃতি স্থবির হয়ে পড়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের সংসদে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হয়নি, বরং এটি একান্ত ভারতের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
মোদির এই বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। চলতি বছরের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য বলে দাবি করলেও নয়াদিল্লি তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রকাশিত এক পোস্টে লিখেছেন, “ভারত আমাদের বন্ধু হলেও- তাদের শুল্ক হার অত্যন্ত বেশি, বিশ্বের মধ্যে অন্যতম উচ্চ, আর তারা রাশিয়া থেকে তেল ও অস্ত্র কিনে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে সহায়তা করছে।”
তিনি আরো উল্লেখ করেন, “বছরের পর বছর আমরা ভারতের সঙ্গে খুব কম বাণিজ্য করেছি, কারণ তাদের শুল্ক ও বাণিজ্য বাধা অত্যন্ত কঠিন ও বিরক্তিকর।”
মোদির বক্তব্য ও ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণা এমন সময় এসেছে যখন দুই দেশের মধ্যে পঞ্চম দফার বাণিজ্য আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং বছরের শেষ নাগাদ একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছিল। নয়াদিল্লি ওই আলোচনাগুলোকে ‘গঠনমূলক’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল, তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।
বাণিজ্যের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন আরো জটিলতায় পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছে চায় কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তি খাতে বাজারে পূর্ণ প্রবেশাধিকার, যা ভারতের জন্য সংবেদনশীল কারণ এতে দেশীয় ডেইরি ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার, যা ভারতের পক্ষে ঘাটতির বিষয়। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার- এসব কারণেই ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ভারতের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। একই রকম নীতি ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়েছে।
শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ভারতের পজিশন কমজোরি হবে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের মতো কম খরচের উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায়। ভারতের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, শুল্ক নিয়ে স্পষ্টতা না আসা পর্যন্ত ভারতের রপ্তানি চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

অপরদিকে, শুল্ক ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তার প্রশাসন পাকিস্তানের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছেছে। তিনি উল্লেখ করেন, একটি মার্কিন কোম্পানি পাকিস্তানের নতুন আবিষ্কৃত বিশাল তেল সম্পদ উন্নয়নে কাজ করবে, যা ভবিষ্যতে ভারতের বাজারে তেল রপ্তানি করতে পারে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও- ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে উভয় দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জটিল ও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। ভূ-রাজনীতি ও জনমত গঠনে এই ধরণের পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের মধ্যকার দূরত্ব বেড়েছে যা আগের তুলনায় অনেক বেশি।
এছাড়াও ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস মার্কিন শুল্ক আরোপের পর মোদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, “ট্রাম্প ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও- মোদি ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার করলেও শেষ পর্যন্ত ভারতের ক্ষতি হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ।”
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একাধিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে যৌথ লক্ষ্যের জন্য কাজ করলেও- বর্তমানে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের পথ ভিন্ন হয়ে গেছে।
সর্বশেষ, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক উত্তেজনা উভয় পক্ষের কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সহযোগিতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

