গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা ও অবরোধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু ঘটেছে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতিকে ‘আসন্ন দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারপরও দীর্ঘ মাস পেরিয়ে অবশেষে ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতিতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিবৃতির বাইরেও কি তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছেন? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, না।
বিবৃতি দিলেও বন্ধ হয়নি বাণিজ্য
যেসব দেশ এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য করছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য—এই দশটি দেশের ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এই দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে গাড়ি, মাইক্রোচিপ, টিকা, পারফিউমসহ নানান বিলাসবহুল ও প্রযুক্তিপণ্য বাণিজ্য করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শুধু আয়ারল্যান্ডই ৩.৫৮ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ আমদানি করেছে ইসরায়েল থেকে। ইতালিও ইসরায়েলে গাড়িসহ নানা প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি করেছে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের।
আইসল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, সাইপ্রাস, মাল্টা, পোল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্পেন—এই নয়টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফ্রান্সও ঘোষণা দিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে।
তবে এই স্বীকৃতি দেওয়ার পরেও দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক চাপ বা কূটনৈতিক প্রতিরোধের উদ্যোগ তারা নেয়নি।
কারা এই বিবৃতিতে সই করেছে?
অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য—এই ২৮টি দেশ বিবৃতিতে সই করেছে।
কিন্তু সবাই এখনও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রত্যাশিতভাবেই ইসরায়েল এই বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন এক্স-এ এক পোস্টে লিখেছেন, “এই বিবৃতিটি বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং হামাসকে ভুল বার্তা দিচ্ছে।”
কূটনৈতিক চাপ কি কাজ করছে?
ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য সম্প্রতি গাজায় ‘তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি’ এবং ‘সব জিম্মির নিঃশর্ত মুক্তির’ দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের অবরোধ ও সহায়তা বন্ধ করার কারণে গাজায় যে দুর্ভিক্ষ তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে তারা।
এমনকি হিলারি ক্লিনটনের মতো দীর্ঘদিনের ইসরায়েলপন্থীরাও এখন গাজায় খাদ্যসঙ্কট নিয়ে কথা বলছেন। এই চাপের মুখে ইসরায়েল ‘মানবিক উদ্দেশ্যে’ দিনে ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কিছু জায়গায় ‘ট্যাকটিক্যাল বিরতি’ ঘোষণা করেছে।
এই ঘোষণার মধ্যেও বাস্তবে গাজায় বোমাবর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। রোববার (২৭ জুলাই) সকালে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারণে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ২ জন শিশু। এখন পর্যন্ত গাজায় দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে মারা গেছে ১৩৩ জন, যার মধ্যে ৮৭ জনই শিশু।
অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯,৮২১ জন এবং আহত হয়েছেন ১,৪৪,৪৭৭ জন।
বিবৃতি আর সমবেদনার ভাষা দিয়ে একটি গণহত্যা থেমে যায় না। যদি দেশগুলো সত্যিই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে অর্থনৈতিকভাবে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা—না হলে এই যুদ্ধের শেষ দেখা যাবে না।

