এই সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ঐতিহাসিক বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘোষণা করেছেন, তাঁর দেশ ও মিত্ররা ইতিমধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার নির্দিষ্ট কাঠামো নিয়ে কাজ করছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টার্মার ভার্চুয়ালি “Coalition of the Willing” নামে পরিচিত সেই দেশগুলোর বৈঠক পরিচালনা করেছেন, যারা শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনকে নিরাপত্তা দিতে আগ্রহী। যুক্তরাজ্য এমনকি তাদের প্রতিরক্ষা প্রধান অ্যাডমিরাল স্যার টনি রাডাকিনকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—“নিরাপত্তা নিশ্চয়তা” বলতে বাস্তবে কী বোঝায়?
ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় চাওয়া ন্যাটো সদস্যপদ হলেও, সেটা আপাতত অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তা সমর্থন করবে না। এমনকি স্লোভাকিয়ার মতো অনেক ন্যাটো দেশও চুপচাপ বিরোধিতা করছে, কারণ এতে জোট সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
শান্তিচুক্তির পর রাশিয়ার পুনরায় হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনকে কিছু কার্যকর নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এজন্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার ৩০টিরও বেশি দেশ নিয়ে এক জোট গড়ে তুলেছেন।
-
আকাশপথে নিরাপত্তা: পোল্যান্ড বা রোমানিয়ার ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে ইউক্রেনের আকাশসীমা রক্ষা করা হতে পারে। তবে এর জন্য শক্ত নিয়ম-কানুন থাকা জরুরি—রাশিয়া যদি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, পাইলটরা পাল্টা আঘাত করতে পারবেন কি না, তা পরিষ্কার থাকতে হবে।
-
কালো সাগর নিয়ন্ত্রণ: রাশিয়ার নৌবহর ঠেকানো এবং ওডেসার মতো বন্দর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
-
স্থলভাগে সীমাবদ্ধতা: ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন ১,০০০ কিমিরও বেশি দীর্ঘ। এত বিশাল এলাকায় সৈন্য মোতায়েন করা অসম্ভব। তাই সহায়তা সীমিত থাকবে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সাপোর্ট ও অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাশিয়া কী মেনে নেবে? অনেক বিশ্লেষক বলছেন, মস্কোর কিছু বলার অধিকার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো দেশই ইউক্রেনে সৈন্য পাঠাতে রাজি নয়। ব্রিটিশ সামরিক বিশ্লেষক জন ফোরম্যান ধারণা দেন, রাশিয়া হয়তো কোনো পর্যায়ে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ন্যাটো থেকে দূরে থাকার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা মেনে নিতে পারে। তবে সেটি কার্যত ইউক্রেনকে ভাগ করার সমান।
“Coalition of the Willing”-এর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য। ট্রাম্প প্রথমে অনাগ্রহ দেখালেও এখন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত থাকবে, তবে ইউক্রেনে কোনো আমেরিকান সেনা মোতায়েন করা হবে না। আদর্শভাবে ইউক্রেন চাইছে যুক্তরাষ্ট্র শুধু অস্ত্র নয়, প্রয়োজনে বিমান শক্তি দিয়ে সরাসরি সহায়তা করুক। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান বারবার পাল্টানোয় এটি অনিশ্চিত।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল বেন হজেসের মতে, “যুক্তরাষ্ট্র আসলেই ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় আন্তরিক কি না, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। শুধু কথায় কাজ হবে না।”
মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা শক্তিশালী হবে? খুব দুর্বল হলে রাশিয়াকে ভয় দেখাতে পারবে না। আবার খুব শক্ত হলে রাশিয়া সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলোকে হুমকি দিতে পারে।
সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যার বেন ওয়ালেসের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো এখনো ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নেয়নি। “পুতিন হত্যা থামাতে চান এমন কোনো লক্ষণ নেই। ট্রাম্প বা ইউরোপ কেউই যদি তাকে থামাতে না চায়, তবে আসল অগ্রগতি হবে না,” তিনি বলেন।
লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক RUSI-এর গবেষক এডওয়ার্ড আর্নল্ড মনে করেন, জোটটি একটি নমনীয় কাঠামো দিয়েছে যা ট্রাম্পের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন—“এখনও এটি একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, কোনো কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নয়। আগামী কয়েক মাসেই আসল পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।”

