ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকার সৈন্যরা ইউক্রেনের মাটিতে যাবে না, তবে মার্কিন বিমান বাহিনী দেশটির আকাশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, একটি শান্তিচুক্তি হলে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আকাশপথেই যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে। এতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, “আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই, বিশেষ করে আকাশপথে। কারণ, আমাদের মতো প্রযুক্তি আর কারও নেই।”
ইউরোপীয় নেতাদের উদ্যোগ ও মার্কিন অবস্থান
লন্ডন ও ব্রাসেলস সূত্র বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে ট্রাম্পের আলোচনা এখনো বিস্তৃত ও অস্পষ্ট পর্যায়ে রয়েছে। তবে ইউরোপের বড় অংশই একটি “রিএস্যুরেন্স ফোর্স” বা আশ্বাস বাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতিমধ্যেই তাদের সামরিক প্রধানদের ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছেন।
৩০টিরও বেশি দেশ—জাপান, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডসহ—এই পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই স্থল সেনা পাঠাবে না।
ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভালতোনেন জানান, ইউক্রেনের জন্য সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামো তৈরিতে কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট আলোচনা হওয়ার কথা।
যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনা ও আকাশসীমা সুরক্ষা
পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা, শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের ভেঙে পড়া সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠনে বিদেশি প্রশিক্ষক পাঠানো হতে পারে। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল আবার শুরু করার লক্ষ্যে ইউক্রেনের আকাশে পশ্চিমা যুদ্ধবিমান টহল দেবে।
ইউক্রেনকে সাহায্য করতে মার্কিন বিমান বাহিনী সম্ভবত প্রতিবেশী দেশ থেকে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র চালাবে
এছাড়া কৃষ্ণসাগরে নৌবাহিনী মোতায়েন এবং পূর্ব ইউরোপে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এক ইউরোপীয় কূটনীতিকের মতে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের একজন জেনারেল এই যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামোয় যুক্ত হতে পারেন।
এদিকে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদি ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্প ও জেলেনস্কির সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে রাজি না হন, তবে এসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে পারে।
জেলেনস্কি আগেই দাবি করেছেন, পুতিন যদি বৈঠক এড়িয়ে যান তবে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প টেলিফোনে পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বৈঠকে অংশ নিতে রাজি হয়েছেন। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, এমন বৈঠক খুব সতর্কভাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
ট্রাম্পের তাড়াহুড়া ও বৈঠকের প্রস্তাব
ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “ইউরোপীয় নেতারা বলছিলেন এক-দু’মাস পর দেখা করা যাক। আমি বললাম, এক-দু’মাসে আরও ৪০ হাজার মানুষ মারা যেতে পারে। তাই আমি আজই পুতিনকে ফোন করেছি এবং জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও জানান, যদি আলোচনা সফল হয় তবে তিনি নিজেও ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেবেন এবং চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা করবেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পর তিনি হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেছেন। ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়ে অরবান যেভাবে বাধা দিচ্ছেন, সে বিষয়টি নিয়েই আলাপ হয়েছে বলে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সাড়ে তিন বছর পর অবশেষে শান্তির আলোচনায় গতি আসছে। তবে বাস্তবে কোনো সমঝোতা কবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। আকাশসীমা টহল থেকে শুরু করে নিষেধাজ্ঞার হুমকি—সবই এখন কূটনৈতিক টেবিলে। বিশ্ব তাকিয়ে আছে ট্রাম্প, জেলেনস্কি ও পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে, যা হয়তো এই দীর্ঘ যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।