জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যার অপরাধ করেছে। তদন্তে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডকে উস্কানির মাধ্যমে পরিচালনা করেছেন।
কমিশনের ৭২ পৃষ্ঠার বিশদ আইনগত বিশ্লেষণে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, মানবিক সহায়তা বন্ধ রাখা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং গর্ভধারণ ক্লিনিক ধ্বংস করা। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতামতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
“গাজায় গণহত্যা হচ্ছে,” বলেছেন নাভি পিল্লে, যিনি দখলকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলের ওপর জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রাক্তন বিচারক। তিনি বলেন, “এই জঘন্য অপরাধের জন্য দায়িত্ব সরাসরি ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপর, যারা প্রায় দুই বছর ধরে ফিলিস্তিনি জনগণকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে গণহত্যামূলক অভিযান চালাচ্ছে।”
ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েল কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছে। জেনেভায় অবস্থিত ইসরায়েলের কূটনৈতিক মিশন কমিশনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেছে। বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, “ইসরায়েল এই বিকৃত ও মিথ্যা প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে এবং এই তদন্ত কমিশন অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে।”
তবে কমিশনের ৭২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী আইনগত অনুসন্ধান হিসেবে বিবেচিত। যদিও জাতিসংঘ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেনি, কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইসরায়েল হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার মামলা মোকাবিলা করছে। ইসরায়েল এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর আত্মরক্ষার অধিকার ব্যবহার করছে। সেই হামলায় ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী ১,২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ মানুষকে বন্দি করা হয়েছিল।
গণহত্যার প্রমাণ
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত গাজায় ৬৪,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষক সংস্থা জানাচ্ছে, এলাকার একটি অংশের মানুষ ক্ষুধার্ত।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে বলা হয়েছে, “জাতীয়, জাতিগত, বর্ণ বা ধর্মীয় কোনো গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ” গণহত্যা হিসেবে গণ্য হবে। এই পাঁচটি অপরাধের মধ্যে অন্তত একটি ঘটলে তা গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তদন্ত কমিশন দেখেছে, ইসরায়েল এই পাঁচটির মধ্যে চারটি করেছে—
-
হত্যা করা,
-
গুরুতর শারীরিক বা মানসিক আঘাত প্রদানের মাধ্যমে,
-
জীবনধারার এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যা ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করে,
-
জন্মনিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ চাপিয়ে দেওয়া।
প্রমাণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে: ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সাক্ষাৎকার, চিকিৎসকরা দ্বারা দেওয়া তথ্য, যাচাই করা উন্মুক্ত নথি এবং যুদ্ধে শুরু থেকে নেওয়া স্যাটেলাইট চিত্র।
নেতানিয়াহু ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা
কমিশন দেখেছে, নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিবৃতি “গণহত্যার উদ্দেশ্যের সরাসরি প্রমাণ”। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে নেতানিয়াহু সেনাদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে গাজার অভিযানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে হিব্রু বাইবেলের “মোট ধ্বংসের পবিত্র যুদ্ধে”।
প্রতিবেদনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজাক হার্জগ এবং প্রাক্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের নামও রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার পিল্লে, যিনি ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় এক মিলিয়নের বেশি মানুষ হত্যার তদন্তে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বলেছেন, “রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনা ও গাজার পরিস্থিতি অনেকটা একইরকম। আপনি যদি ভুক্তভোগীদের মানুষ হিসেবে দেখেন না, তাদের পশুর মতো বিবেচনা করেন, তখন মানবতার বোধহীন হয়ে হত্যার পথ খোলা থাকে।”
পিল্লে বলেন, “আমি আশা করি, আমাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মনে আঘাত লাগবে এবং তারা সত্যিকারের দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেবে।” তিনি নভেম্বর মাসে অবসর গ্রহণ করছেন।

