যুদ্ধবিরতির পরও গাজার চিত্র একদম শান্ত নয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে দম নেওয়া উপত্যকায় আবারও দেখা মিলছে পরিচিত সেই সবুজ ব্যান্ডানার যোদ্ধাদের। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস ফের গাজার রাস্তায় টহল শুরু করেছে—এ যেন ইসরাইলের প্রতি এক নীরব বার্তা, “আমরাই এখনো এখানে আছি।”
যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি সেনারা যখন ধীরে ধীরে পিছু হটছে, ঠিক তখনই হামাস মাঠে নেমেছে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ নিতে। লক্ষ্য—গাজায় ছড়িয়ে পড়া গ্যাং, ত্রাণ লুটপাটকারী এবং ইসরাইলের সহযোগীদের দমন করা। কয়েক দিনের মধ্যেই বহু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কেউ কেউ সংঘর্ষে প্রাণও হারিয়েছেন। এমনকি ইসরাইলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে আটজনকে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ও লেখক আজ্জাম তামিমি বলেছেন, “শেষ পর্যন্ত ইসরাইলকেই হামাসের সঙ্গে চুক্তিতে আসতে হয়েছে। নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য ছিল হামাসকে ধ্বংস করা—সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি।”
তামিমির প্রশ্ন, “যখন হামাস টিকে আছে, তখন কেউ কীভাবে ভাবতে পারে তারা হারিয়ে যাবে?”
তার কথায়, হামাসের টহল আসলে প্রতিরোধের নতুন রূপ। এটি প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনায় যে ‘হামাসবিহীন গাজা’র কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা সহজ হবে না।
ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক মুহাম্মাদ শেহাদা মনে করেন, হামাসের এই অভিযান একাধিক উদ্দেশ্য পূরণ করছে। গাজার অর্থনীতি বিঘ্নিত করা গ্যাংগুলোকে দমন করা, অবৈধ অস্ত্রের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া—সবই এই প্রক্রিয়ার অংশ।
তার মতে, “হামাসের দ্রুত পুনরুত্থান দেখিয়েছে, বাইরের কোনো পরিকল্পনা দিয়ে এই শক্তিকে সরানো সম্ভব নয়।”
তামিমিও একই সুরে বলেন, “হামাসই একমাত্র শক্তি, যাকে গাজার সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার জন্য বিশ্বাস করে।”
হামাস বারবারই বলেছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র নামাবে না। জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম সরাসরি বলেছেন, “কেউ আমাদের অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।”
আরেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজ্জাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, “আপনি যে অস্ত্র হস্তান্তরের কথা বলছেন, সেটা কার কাছে দিতে হবে? কারা সেই শান্তিরক্ষী?”
আরব কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা হামাসের সঙ্গে আলোচনা করছে যাতে তাদের অস্ত্রগুলো আরব শান্তিরক্ষী বাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা যায়। তবে হামাসের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া আসেনি।
হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে—গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না। তাদের নেতারা বলছেন, “প্রয়োজনে আমরা আরও দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে যাব।”
যদিও সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, গাজা ও পশ্চিম তীরে হামাস কিছুটা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ’র চেয়ে তাদের প্রভাব এখনো অনেক বেশি। বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি এখনো মনে করেন, প্রতিরোধের পথেই মুক্তির সম্ভাবনা বেশি।
শেহাদার ভাষায়, “হামাস একদিকে একটি সরকার, অন্যদিকে একটি প্রতিরোধ সংগঠন। মানুষ হয়তো তাদের রাজনৈতিক রূপ পছন্দ করে না, কিন্তু প্রতিরোধের রূপে এখনো তাদের সমর্থন করে।”
ব্রিটিশ লেখক হেলেনা কোব্যান, যিনি “আন্ডারস্ট্যান্ডিং হামাস: অ্যান্ড হোয়াই দ্যাট ম্যাটারস” বইয়ের সহলেখক, তিনি বলেন, “হামাসের আলোচকরা ট্রাম্পের পরিকল্পনার মাত্র প্রথম ছয়টি পয়েন্ট নিয়ে কথা বলেছে। বাকি ১৪টি পয়েন্টের বিষয়ে তারা নীরব থেকেছে। এতে স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে গাজার শাসনে হামাসকে বাদ দেওয়া যাবে না।”
তার মতে, ইসরাইল শুধু হামাসের যোদ্ধাদেরই নয়, বরং রাজনৈতিক নেতাদের ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছে—যা আসলে এই আন্দোলনের গভীর শিকড়কেই আরও দৃঢ় করেছে।
গাজার আকাশে এখন তুলনামূলক শান্তি, কিন্তু মাটির নিচে simmer করছে এক নতুন বাস্তবতা। যুদ্ধবিরতির পরেও গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হামাসের দৃঢ় অবস্থান যেন একটাই কথা বলে—
গাজার নিয়ন্ত্রণ হয়তো দখল করা যায়, কিন্তু গাজার আত্মা নয়।

