ফিরে দেখা-
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় প্রথম বিপ্লবের ফলে জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন এবং রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই বিপ্লব কেবল শাসনের হাতবদল ঘটিয়েছিল; শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য শ্রমজীবী জনগণ ছিল একেবারেই তৃপ্ত নয়। তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় দ্বিতীয় বিপ্লব, যা লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে।
পুরোনো জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবর মাসে সংঘটিত হওয়ায় এটিকে ‘অক্টোবর বিপ্লব’ বলা হয়। এবার বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক, কয়েক মাসের মধ্যেই কেন বলশেভিকরা দ্বিতীয় বিপ্লবের পথ বেছে নেয়।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব ছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। এটি রাশিয়ার দীর্ঘদিনের জারী স্বৈরাচারী শাসনকে একেবারে বদলে দেয়। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা নতুন সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। মার্কিন সাংবাদিক জন রিড এই বিপ্লবকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ শিরোনামে বর্ণনা করেছেন। এই বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার গড়ে ওঠে।
১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসমূহের ইউনিয়ন (সোভিয়েত ইউনিয়ন) গঠিত হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বের দুটি মেরুর রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়—পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা এবং সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হওয়া ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বলশেভিক বিপ্লবের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আদর্শগত প্রভাব বিশ্বব্যাপী লক্ষ্য করা যায়।
বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি ও সামাজিক অসন্তোষ-
১৯১৭ সালের রাশিয়ার বিপ্লবের পেছনে সামাজিক অসন্তোষ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে জমির অধিকারকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। ১৮৬১ সালে জার দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার কর্তৃক দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও কৃষকদের হাতে যে জমি প্রদান করা হয়েছিল, তার জন্য সরকারকে অর্থ পরিশোধ করতে হতো। সেই সাথে তারা চাষ করা জমির মালিকানা দাবি করত, যা চলমান বৈষম্য এবং ভূমি সংস্কারের ব্যর্থতার কারণে তীব্র হয়ে ওঠে। দেশের মোট জমির মাত্র ২৫ শতাংশের মালিকানা ছিল জনগণের হাতে, আর বাকি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল সামন্ত এবং ধনী শ্রেণীর হাতে।
শহরাঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ১৯ শতকের শেষ ভাগে গ্রামীণ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বাঁচার জন্য শহরে অভিবাসন করে নতুন ‘প্রলেতারিয়েত’ তৈরি হয়। শিল্প বিপ্লব রাশিয়ার শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তাহীন কাজের পরিবেশ, অল্প মজুরি এবং সীমিত শ্রমিক অধিকার নিয়ে আসে। পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা এই সময়ে শিল্প বিপ্লবের ফলে অর্জিত সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল, কিন্তু রুশ শ্রমিকরা তা পায়নি। ফলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ জন্মায় এবং তারা ধর্মঘট বা প্রতিবাদের মাধ্যমে নিজেদের দাবি জানাতে শুরু করে।
১৯১৪ সালে রাশিয়া যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করে, তখন কলকারখানায় উৎপাদন চাপ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধবিরোধী মনোভাব থাকা শ্রমিকরা যুদ্ধ সরবরাহের জন্য চাপের মুখে পড়ে, ফলে আরও বেশি দাঙ্গা এবং ধর্মঘট হয়। কৃষক ও শ্রমিকদের এই অসন্তোষকে প্রলেতারিয়েত সমর্থন দেয়।
পূর্বাভাস ও বিপ্লবী নেতৃত্ব-
১৯০৫ সালে লেনিন প্রথমবারের মতো সোভিয়েত বিপ্লবের সক্ষমতা আন্দাজ করেছিলেন। তখন মেনশেভিক ও সোশ্যাল রেভল্যুশনারিরা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সীমিত এবং পশ্চিমা ধরনের ধারা অনুসরণ করছিল। বিপরীতে বলশেভিকরা ‘রুটি, জমি, শান্তি’ এবং ‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে চাই’ স্লোগান ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সমর্থন আকর্ষণ করেছিল।
রাশিয়ার জনগণের অসন্তোষের আরও একটি কারণ ছিল জারের স্বৈরাচারী শাসন। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের নীতি ছিল ‘এক জার, এক চার্চ, এক রাশিয়া’। তার বাবা তৃতীয় আলেক্সান্ডারের মতো তিনি ‘রুশিফিকেশন’ বা রুশকরণ নীতি চালু করেছিলেন, যার মাধ্যমে বেলারুশ ও ফিনল্যান্ডের মতো অজাতিগত রাশিয়ান সম্প্রদায়কে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
এছাড়া জার রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের প্রধানও ছিলেন। চার্চের মাধ্যমে জারের কর্তৃত্বকে ঈশ্বরের নির্দেশিত হিসেবে প্রচার করা হতো। নিরক্ষর জনগণ চার্চের কথা মেনে চলত, কিন্তু ধীরে ধীরে কৃষকরা পাদরিদের দুর্নীতি ও ভণ্ডতা দেখতে শুরু করে।
সেনাবাহিনীও যুদ্ধের কারণে অসন্তোষের শিকার হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ার সেনাদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও, খাদ্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদের অভাব যুদ্ধকে ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিয়ে আসে। ১৯১৬ সালের নভেম্বরে ৫০ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত, আহত বা বন্দী হয়। সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহ এবং দলত্যাগ শুরু হয়।
প্রথম বিপ্লব ও সাময়িক সরকার-
ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় প্রথম বিপ্লব সংঘটিত হয়। পুত্রগ্রাদে শ্রমিকরা কারখানায় ধর্মঘট শুরু করে এবং শান্তিপূর্ণ অভিযাত্রায় পুলিশ ও সেনার মুখোমুখি হয়। ‘রক্তাক্ত রবিবার’-এর ১২ বছর পূর্তি উদযাপনের মাধ্যমে বিপ্লবের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়। শ্রমিকরা অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং পেত্রোগ্রাদ দখল করে। সেনারা জারের মন্ত্রীদের গ্রেপ্তার করে এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়।
২ মার্চ (১৫ মার্চ/গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন। এর ফলে জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মার্কিন সাংবাদিক জন রিড উল্লেখ করেছেন, বুর্জোয়া শ্রেণি কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা চেয়েছিল। শ্রমিক, কৃষক এবং অন্যান্য শ্রমজীবী জনগণ চাইছিল যুদ্ধের সমাপ্তি এবং শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কার।
দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রয়োজন-
ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর সাময়িক সরকারে মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভল্যুশনারি পার্টি যোগ দেয়। তারা মূলত পশ্চিমা ধরনের উদারনৈতিক শাসনের দিকে মনোযোগী ছিল। তবে লেনিন এই সরকারে যোগ দেয়নি। তিনি সুইজারল্যান্ড থেকে ফিরে ‘এপ্রিল থিসিস’ প্রকাশ করেন।
এতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, শ্রমিক ও কৃষকদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে, সাময়িক সরকারকে কোনো সহযোগিতা নয়, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। লেনিন ঘোষণা করেন, রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই।
১৯০৫ সালে বলশেভিকরা ইতিমধ্যেই বিপ্লবের জন্য সাধারণ মানুষের সমর্থন এবং সোভিয়েতের ক্ষমতা পর্যালোচনা করেছিল। শ্রমিক এবং কৃষকের সমর্থন পেয়ে, তারা রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করে। ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা) বলশেভিকদের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। এটি জুলিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী অক্টোবর মাসে হওয়ায় ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত।
বিপ্লবের ফলাফল-
অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে লেনিন ও তার সমর্থক বলশেভিকরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। রাশিয়ায় গড়ে ওঠে প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার, যা পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরি করে। বলশেভিক বিপ্লবের আদর্শিক প্রভাব ছিল বিশ্বব্যাপী। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা, বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনে, বিপ্লবের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
বিগত অভিজ্ঞতা ও বিপ্লবের ইতিহাস প্রমাণ করে, সামাজিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, যুদ্ধবিরোধী মনোভাব এবং রাজনৈতিক উদারতার অভাব মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী আন্দোলনের জন্ম দেয়। বলশেভিকরা দ্বিতীয় বিপ্লব বেছে নিয়েছিল কারণ তারা দেখেছিল ফেব্রুয়ারি বিপ্লব কেবল ক্ষমতার হাতবদল ঘটিয়েছে, কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তন আনি…।
তথ্যসূত্র: থট কো, সাপ্তাহিক একতা, বিবিসি, প্রথম আলো, আনন্দবাজার

