চ্যাটজিপিটির মতো নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল বাজারে এনেছে চীনা তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিপসিক। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাজারে আসার পর থেকেই এটি বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি কাড়ছে। চীন যে প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে এগোচ্ছে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ডিপসিক।
চ্যাটজিপিটি যখন বাজারে আসে, তখন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কম ছিল কিন্তু ডিপসিকের ৪০ বছর বয়সী প্রতিষ্ঠাতা লিয়াং ওয়েংফেং কেবল একটি এআই মডেল বাজারে এনে সরাসরি সাড়া ফেলেছেন। দ্রুতই তিনি বিলিয়নিয়ারদের কাতারে নাম লেখান এবং বর্তমানে চীনের শীর্ষ ১০০ ধনীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য অনুযায়ী, ডিপসিকের বর্তমান মূল্য ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
ডিপসিক দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কম খরচে মডেল তৈরি এবং আলিবাবার সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে কোম্পানিটি এখন আলোচনায়। সাধারণত নতুন কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি বাজারে আসলে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসে, তবে ডিপসিকের ক্ষেত্রে তা হয়নি। লিয়াং এখনো নিজের অর্থেই কোম্পানিটি চালাচ্ছেন। এক যুগ আগে তিনি ‘হাইফ্লাইয়ার’ নামে যে হেজ ফান্ড গঠন করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের আয়েই ডিপসিক পরিচালিত হচ্ছে।
কর্মক্ষমতার দিক থেকে ডিপসিক চ্যাটজিপিটির খুব বেশি পিছনে নয়। তবে মূল্যায়নে এখনও অনেক কম। চলতি বছরের মার্চে জাপানের সফটব্যাংকের বিনিয়োগের সময় চ্যাটজিপিটির মূল্যায়ন ছিল ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ডিপসিকের বর্তমান মূল্য চ্যাটজিপিটির ৫ থেকে ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ১ হাজার ৫০০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার কোটি ডলার। কেউ কেউ মনে করেন, চ্যাটজিপিটির বর্তমান মূল্য ৫০০ বিলিয়ন বা ৫০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
বাজারে আসার পর চ্যাটজিপিটি একের পর এক নতুন বা উন্নত মডেল এনেছে। তবে ডিপসিক এখন পর্যন্ত কেবল হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করেছে, নতুন মডেল আনতে পারেনি। ব্যবসার দিক থেকেও তারা পিছিয়ে। গত বছর চ্যাটজিপিটি সাবস্ক্রিপশন থেকে ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার আয় করেছে। বিপরীতে ডিপসিকের আয় খুবই কম। চ্যাটজিপিটির বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারী ৭০ কোটির বেশি, যাঁদের কাছ থেকে মাসে ২০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত মাশুল আদায় করা হয়।
ডিপসিক প্রায় বিনা মূল্যে সেবা দিচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের সক্রিয় ব্যবহারকারী ছিল ৭ কোটি ৩০ লাখ। ডেভেলপারদের কাছ থেকে তারা মাশুল নিলেও তা সীমিত। ডেটা প্রসেসিংয়ের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারণ করা হয়। তুলনায় চ্যাটজিপিটি তাদের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি মাশুল আদায় করে। ডিপসিকের আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে লিয়াং স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, লক্ষ্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ধরে রাখা। চীন এ ক্ষেত্রে দ্রুত এগোচ্ছে এবং ডিপসিক প্রযুক্তির সীমানা আরও বাড়াতে চায়।
লিয়াং ওয়েংফেংয়ের পরিবার সম্পদশালী ছিল না। তার বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ভিশনে পড়াশোনা করার সময় এআই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ২০১০ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি ‘হাই-ফ্লায়ার’ হেজ ফান্ড গঠন করেন। প্রেকুইনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্রায় ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার সম্পদ পরিচালনা করছে।
গত সেপ্টেম্বরে নেচার জার্নালের প্রচ্ছদে প্রকাশিত লিয়াং ও তাঁর দলের গবেষণাপত্রে ডিপসিকের প্রশিক্ষণপদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতিটি এআই মডেল প্রশিক্ষণে খরচ হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার। তুলনায় ওপেনএআই নাকি জিপিটি-৫-এর ছয় মাসের এক পর্যায়ের প্রশিক্ষণে ব্যয় করেছে ৫০ কোটি ডলার। তবে ডিপসিকের হিসাব থেকে হার্ডওয়্যার, বিশেষ করে এনভিডিয়া চিপ কেনার খরচ, আনুমানিক ১৬০ কোটি ডলার, অন্তর্ভুক্ত নয় বলে জানায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেমিঅ্যানালিসিস।
যুক্তরাষ্ট্রে চিপ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জোরদার হওয়ায় ডিপসিক এখন চীনা টেলিকম কোম্পানি হুয়াওয়ের চিপ কিনছে। সেমিঅ্যানালিসিসের বিশ্লেষক এ জে কৌরাবি এ তথ্য জানিয়েছেন।

