ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য এই উত্তেজনাকে আরও স্পর্শকাতর জায়গায় নিয়ে গেছে। একদিকে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়েছেন, এমনকি ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অন্যদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়।
ট্রাম্পের ভাষায়, পরমাণু অস্ত্র এমন এক অস্ত্র, যার ব্যবহার ঠেকানোই বিশ্বের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন অস্ত্র যাতে কেউ কোনোভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
এই বক্তব্য আপাতভাবে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না। কারণ ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করলেও বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কি চাইলে একাই ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন?
প্রশ্নটি সাধারণ মনে হলেও এর উত্তর সরল নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে সামরিক ক্ষমতা অনেক বড়, কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংবিধান, কংগ্রেস, সামরিক বিধান, আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিকতা এবং বৈশ্বিক কূটনীতির জটিল সমীকরণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রেসিডেন্টকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক করেছে। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীর কার্যকর নেতৃত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে। কিন্তু একই সংবিধান যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা দিয়েছে কংগ্রেসকে। ফলে প্রেসিডেন্ট সামরিক অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানবিষয়ক সরকারি ব্যাখ্যাতেও প্রেসিডেন্টের সর্বাধিনায়ক ভূমিকা এবং কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতাকে পৃথকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এখানেই আইনি বিতর্কের শুরু। প্রেসিডেন্ট জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সামরিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় স্বীকৃত। কিন্তু ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড় মাত্রার হামলা, বিশেষ করে পারমাণবিক হামলা, কোনো সাধারণ সামরিক পদক্ষেপ নয়। এটি এমন এক সিদ্ধান্ত, যার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অতীতে বহুবার কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার বাইরে গিয়ে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। কখনো তা করা হয়েছে নাগরিক সুরক্ষার যুক্তিতে, কখনো মিত্র রক্ষার নামে, কখনো আবার তাৎক্ষণিক হুমকির কথা বলে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে “তাৎক্ষণিক হুমকি” প্রমাণ করা সহজ বিষয় নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি বা অবশ্যম্ভাবী হামলার স্পষ্ট প্রমাণ না থাকে, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে আগাম হামলা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এখানে ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার রেজ্যুলশনও গুরুত্বপূর্ণ। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট যেন একতরফাভাবে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালাতে না পারেন। এর আওতায় কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক অভিযান শুরু হলে প্রেসিডেন্টকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হয় এবং ৬০ দিনের মধ্যে অনুমোদন নিতে হয়। তবে পারমাণবিক হামলার মতো তাৎক্ষণিক ও বিধ্বংসী পদক্ষেপ এই কাঠামোর ভেতরে কীভাবে বিবেচিত হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ এমন হামলার পর অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ক্ষতি তখন আর ফেরানো যাবে না।
পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাটি আরও সংবেদনশীল। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার একক ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ তিনি সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায়ও বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসসহ অন্য কারও সঙ্গে পরামর্শ না করেই পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন—যদিও এই ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি রয়েছে।
কিন্তু “ক্ষমতা থাকা” আর “আইনসম্মত হওয়া” এক জিনিস নয়। প্রেসিডেন্ট নির্দেশ দিতে পারেন বলেই যে সেই নির্দেশ বৈধ হবে, এমন নয়। কোনো সামরিক আদেশ যদি আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক আইন বা যুদ্ধের মৌলিক নীতির পরিপন্থী হয়, তাহলে সেটি বাস্তবায়ন নিয়ে সামরিক পর্যায়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা আইনসিদ্ধ আদেশ পালন করতে বাধ্য, কিন্তু স্পষ্টত অবৈধ আদেশ পালন করতে বাধ্য নন—এই নীতি বহুবার আলোচিত হয়েছে। ২০১৭ সালেও মার্কিন পারমাণবিক কমান্ড–সংশ্লিষ্ট আলোচনায় বলা হয়েছিল, অবৈধ পারমাণবিক হামলার নির্দেশ এলে সামরিক নেতৃত্ব তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারে না। ব্যতিক্রম মূলত দুটি—নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন অথবা আত্মরক্ষার প্রয়োজন। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হলেও সেটি সাধারণত সশস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে প্রযোজ্য।
অতএব, ইরান যদি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলা না চালায় বা এমন হামলার অবশ্যম্ভাবী প্রমাণ না থাকে, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনে খুব দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা এত ব্যাপক যে, এর ব্যবহার বেসামরিক প্রাণহানি, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। এসব কারণে এমন হামলা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।
এখানে সামরিক বাস্তবতাও বিবেচ্য। পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে দ্রুত নেওয়া সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি বহু স্তরের যোগাযোগ, যাচাই, সামরিক বিকল্প নির্বাচন এবং আদেশ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। প্রেসিডেন্টের নির্দেশই চূড়ান্ত সূচনা হতে পারে, কিন্তু আদেশটি সামরিক কমান্ডের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যদি সেই আদেশকে স্পষ্টত অবৈধ মনে করা হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই বাধা কতটা কার্যকর হবে, সেটি পরিস্থিতি, সময় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও অস্বস্তিতে পড়বে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বহু দেশ এমন পদক্ষেপকে অস্থিতিশীলতার সূচনা হিসেবে দেখবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কূটনৈতিক জোট দুর্বল হতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী মার্কিন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আরও বড় ঝুঁকি হলো পাল্টা প্রতিক্রিয়া। ইরান সরাসরি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র না হলেও তার আঞ্চলিক প্রভাব, মিত্রগোষ্ঠী এবং সামরিক সক্ষমতা উপেক্ষা করার মতো নয়। পারমাণবিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি, মিত্র দেশ, বাণিজ্যপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে এমন সিদ্ধান্ত শুধু ইরানকে আঘাত করবে না; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করতে পারে।
তাই মূল প্রশ্নের উত্তর দাঁড়ায়—তাত্ত্বিকভাবে ট্রাম্প পারমাণবিক হামলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতা আইনি, সামরিক, সাংবিধানিক, আন্তর্জাতিক এবং রাজনৈতিক নানা সীমার মধ্যে আবদ্ধ। প্রেসিডেন্টের হাতে বড় ক্ষমতা আছে, কিন্তু তা অবাধ নয়। বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের মতো চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কোনো একক রাজনৈতিক আবেগ বা হুমকির ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
ইরান সংকট তাই শুধু দুই দেশের উত্তেজনার গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, আধুনিক বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রশ্ন কতটা ভয়ংকর এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা একজন নেতার সিদ্ধান্ত কতটা বৈশ্বিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ট্রাম্প আজ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা, বৈধতা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়া।
কারণ পারমাণবিক হামলা কখনোই শুধু একটি সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি আইন, নৈতিকতা, মানবতা এবং সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আর সেই কারণেই ইরানে পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনা যতই তাত্ত্বিক হোক, এর প্রতিটি দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
সিভি/এইচএম

