যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর বেলারুশ ১২৩ জন বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী আলেস বিলিয়াটস্কি এবং বিরোধীদলীয় শীর্ষ নেতা মারিয়া কালেসনিকোভা।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলারুশবিষয়ক বিশেষ দূত জন কোয়েলের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর বৈঠকের পর এই বন্দিমুক্তির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
এর আগে গত মাসে জন কোয়েলকে বেলারুশবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র বেলারুশে এক হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত বেলারুশ দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। দেশটি বিশ্বে সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পটাশের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক। বেলারুশের পটাশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়েই এই বন্দিমুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জন কোয়েল বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোকে বেলারুশের বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
মারিয়া কালেসনিকোভা ২০২০ সাল থেকে কারাবন্দী ছিলেন। দীর্ঘ এই সময়ের বড় অংশই তাকে একাকী নির্জন কক্ষে রাখা হয়েছিল। তার মুক্তির দাবিতে শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছিলেন তার বোন তাতিয়ানা খোমিচ। শনিবার মুক্তির পরপরই ভিডিও কলে বোনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন বলে বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
খোমিচ জানান, মুক্তির পর কালেসনিকোভা ভালো আছেন এবং সুস্থ রয়েছেন। বোনকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় আছেন বলেও তিনি জানান। শনিবার কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া একটি দল শিগগিরই লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের বাইরে ইতোমধ্যে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছে।
খোমিচ বলেন, কথা বলার সময় কালেসনিকোভা প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আলোচনায় নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের জন্য বেলারুশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
এই সমঝোতাকে প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেলারুশের একঘরে অবস্থার কিছুটা অবসান ঘটতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে ব্যাপক বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন লুকাশেঙ্কো। সেই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিরোধীরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ তা কঠোরভাবে দমন করে। ওই সময় বিরোধী শিবিরের শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যেই ছিলেন মারিয়া কালেসনিকোভা। এরপর থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করলে পশ্চিমা দেশগুলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বেলারুশের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় বেলারুশ হয়ে রুশ সেনারা ইউক্রেনে প্রবেশ করে এবং বেলারুশের ভূখণ্ড থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
বেলারুশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পটাশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হবে। একই সঙ্গে মার্কিন দূত জানিয়েছেন, লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় মিনস্ক কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে—সে বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
মিনস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। কারণ ইইউ এখনো বেলারুশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক একঘরে রাখার নীতি অনুসরণ করে যাচ্ছে।

