দক্ষিণ লেবাননের আকাশে তোলা স্যাটেলাইট ছবি যেন এক নিঃশব্দ সাক্ষী—যেখানে যুদ্ধের ভাষা নেই, আছে শুধু ধ্বংসের ছাপ। কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি শহর কীভাবে মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে যেতে পারে, তার নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের একটি স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল শহরের কেন্দ্র ইতোমধ্যেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ভবনগুলোর ওপর ধূসর ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে, যা আগুন ও নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে—২৩ এপ্রিলের ছবিতে—সেই একই এলাকা পুরোপুরি সমতল হয়ে গেছে। যেন কোনো শহরই সেখানে ছিল না।
এই ধ্বংসযজ্ঞের সূত্রপাত মার্চের শুরুতে। ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। এর ঠিক দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা শুধু প্রতিরোধমূলক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নেয় একটি বিস্তৃত ধ্বংস অভিযানে।

প্রথমে বিমান হামলা, এরপর স্থল অভিযান—এই দুই ধাপে দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকা কার্যত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু বোমা হামলাই নয়, মাঠে নেমে বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা এবং বিস্ফোরণের মাধ্যমে পুরো গ্রাম ধ্বংস করার ঘটনাও সামনে এসেছে। এই কৌশলটি অনেক বিশ্লেষকের কাছে গাজায় ব্যবহৃত কৌশলের পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। ১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ার পরও স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, খননযন্ত্র, সাঁজোয়া যান এবং ভারী সরঞ্জাম দিয়ে ধ্বংসের কাজ অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে যুদ্ধ থামলেও বাস্তবে ধ্বংসযজ্ঞ থামেনি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই সতর্কতা জারি করেছে। তাদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গাজার মতোই একটি প্যাটার্ন অনুসরণ করছে—গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, এমনকি বেসামরিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করার মতো কৌশলও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইসরায়েলি নেতৃত্ব অবশ্য এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহ বেসামরিক বাড়িঘরে অস্ত্র মজুত রাখে এবং সেখান থেকেই হামলা চালায়। তাই এসব অবকাঠামো ধ্বংস করা সামরিকভাবে প্রয়োজনীয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এমনকি সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন, সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর সব ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হবে—যা তিনি “রাফাহ ও বেইত হানুন মডেল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই “মডেল” মূলত গাজার দুটি শহরের উদাহরণ, যেগুলো গত আড়াই বছরে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে লেবাননে একই কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না—সে প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো।
এর পাশাপাশি ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি দীর্ঘমেয়াদি “নিরাপত্তা অঞ্চল” তৈরির পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে। প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে এই অঞ্চল বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে একটি তথাকথিত “ইয়েলো লাইন” নির্ধারণ করা হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে এমন এলাকায় ফিরে আসতে গিয়ে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এই কৌশল গাজায় ব্যবহৃত নীতির সঙ্গে মিল রাখে। প্রথমে একটি অস্থায়ী সীমারেখা, পরে সেটিকে স্থায়ী বাস্তবতায় রূপ দেওয়া—যেখানে সাধারণ মানুষের ফিরে যাওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ লেবানিজ মানুষ ইতোমধ্যেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাদের অনেকেই আগের সংঘাতেও ঘরছাড়া হয়েছিলেন। অর্থাৎ, এই যুদ্ধ তাদের জন্য নতুন নয়, বরং এক দীর্ঘ দুর্ভোগের ধারাবাহিকতা।
দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা হাসান রাম্মালের গল্প সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। ২০২৪ সালে যুদ্ধের সময় তিনি পরিবার নিয়ে বৈরুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে যুদ্ধবিরতির সুযোগে ফিরে গিয়ে ভাঙা ঘরবাড়ি ঠিক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে আবারও সব হারান। শেষ পর্যন্ত ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওতে তিনি দেখেন—তার পুরো গ্রামই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
এমন গল্প শুধু একটি গ্রামের নয়; দক্ষিণ লেবাননের বহু এলাকা এখন একই বাস্তবতার মুখোমুখি। কোথাও সবুজ ক্ষেত্র মাটি হয়ে গেছে, কোথাও শহরের কেন্দ্র সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ধ্বংসের শেষ কোথায়? যুদ্ধবিরতি থাকলেও যদি ধ্বংসযজ্ঞ চলতেই থাকে, তাহলে সেটি কতটা কার্যকর? আর একটি দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি তৈরি হলে, তা কি ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের পথ তৈরি করবে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কৌশল স্বল্পমেয়াদে সামরিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নতুন প্রতিরোধ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, যখন মানুষের ঘরবাড়ি, স্মৃতি ও জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষোভ সহজে মুছে যায় না।
দক্ষিণ লেবাননের ভবিষ্যৎ তাই এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। প্রায় ৬ লাখ মানুষের জন্য প্রশ্ন একটাই—তারা কি কখনও নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে? আর ফিরলেও, সেই ঘর কি আর আগের মতো থাকবে?

