যুক্তরাষ্ট্র চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করেই থেমে যাননি। গত সোমবার সকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও একই ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিধর দেশ। দেশটি সামরিক খাতে যে অর্থ ব্যয় করে, তা পরবর্তী ১০টি বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশের মোট বাজেটের চেয়েও বেশি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
বিপরীতে, ২০২৫ সালের গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ব্রাজিলের, যার বৈশ্বিক অবস্থান ১১তম। মেক্সিকোর অবস্থান ৩২তম, কলম্বিয়া ৪৬তম, ভেনেজুয়েলা ৫০তম এবং কিউবা ৬৭তম। সক্রিয় সেনাসংখ্যা, সামরিক বিমান, যুদ্ধের ট্যাংক, নৌযান এবং সামরিক বাজেট—সব সূচকেই এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
ট্যাংক, যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীভিত্তিক প্রচলিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রায় নিরঙ্কুশ। এই দেশগুলোর হাতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যে একমাত্র উল্লেখযোগ্য শক্তি রয়েছে, তা হলো তাদের আধা সামরিক বাহিনী। এসব বাহিনী নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি কাজ করে এবং প্রচলিত সামরিক কৌশলের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধ ও অপ্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।
লাতিন আমেরিকার বহু দেশে দীর্ঘদিন ধরে আধা সামরিক ও অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ইতিহাস রয়েছে। এসব গোষ্ঠী সাধারণত সশস্ত্র, সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও নিয়মিত সামরিক কমান্ড কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হয়।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, কিউবার আধা সামরিক বাহিনী বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম, যার সদস্যসংখ্যা ১১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়া ও পাড়াভিত্তিক প্রতিরক্ষা কমিটি। সবচেয়ে বড় সংগঠনটি হলো টেরিটরিয়াল ট্রুপস মিলিশিয়া, যা বেসামরিক রিজার্ভ বাহিনী হিসেবে নিয়মিত সেনাবাহিনীকে বহিরাগত হুমকি বা অভ্যন্তরীণ সংকটে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত।
ভেনেজুয়েলায় সরকারপন্থী সশস্ত্র বেসামরিক গোষ্ঠী, যাদের ‘কোলেকতিভো’ নামে পরিচিত। যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনীর অংশ নয়, তবে মাদুরোর শাসনামলে অস্থিরতার সময়ে তারা রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা বা সমর্থনে কাজ করে বলে মনে করা হয়।
কলম্বিয়ায় ১৯৮০-এর দশকে বামপন্থী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় ডানপন্থী আধা সামরিক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসব গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে নিরস্ত্রীকরণ করা হলেও পরে অনেক সংগঠন অপরাধী বা নব্য আধা সামরিক কাঠামোয় পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে এবং গ্রামীণ এলাকায় সক্রিয় থাকে। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্রোহ দমন-সংক্রান্ত উপদেষ্টাদের নির্দেশনায় কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনীর সম্পৃক্ততায় এসব প্রাথমিক গোষ্ঠী সংগঠিত হয়েছিল।
মেক্সিকোতে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত মাদক কার্টেলগুলো কার্যত আধা সামরিক বাহিনীর মতো কাজ করে। জেতাসের মতো গোষ্ঠী, যেগুলো মূলত সাবেক সেনাসদস্যদের দিয়ে গঠিত, সামরিক মানের অস্ত্রের অধিকারী এবং বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা প্রায়ই স্থানীয় পুলিশকে ছাড়িয়ে যায় এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এর জবাবে মেক্সিকান সেনাবাহিনীকে ক্রমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে মোতায়েন করা হচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বলছে- বাজেট, সক্রিয় কর্মী এবং উন্নত সরঞ্জামের দিক থেকে সমস্ত ল্যাটিন আমেরিকান সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকলেও তারা যুদ্ধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রধান বিশ্ব শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তি প্রক্ষেপণের সামনে নিতান্তই তুচ্ছ।
তুলনায় কতটা কার্যকর?
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের তুলনায় লাতিন আমেরিকার সামরিক শক্তি সীমিত কার্যকর। যদিও ব্রাজিল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং কিউবার মতো দেশগুলোর নিজস্ব সেনাবাহিনী এবং আধা সামরিক বাহিনী রয়েছে, তবে তাদের সক্রিয় সেনা, আধুনিক যুদ্ধবিমান, ট্যাঙ্ক ও নৌবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় খুবই নগণ্য।
লাতিন আমেরিকার আধা সামরিক বাহিনী—যেমন কিউবার মিলিশিয়া, ভেনেজুয়েলার কোলেকতিভো বা মেক্সিকোর মাদক কার্টেলভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী—সামরিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু প্রচলিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক শক্তি প্রক্ষেপণের সামনে তাদের কার্যকারিতা সীমিত। অর্থাৎ, তারা সীমিত অঞ্চলে অসম যুদ্ধ বা অনিয়মিত পদ্ধতিতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও, পুরো লাতিন আমেরিকা মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় তেমন সমর্থ নয়।
সূত্র: আল-জাজিরা

