প্রায় এক হাজার দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষের মাধ্যমে গাজা শহরে একই গোত্রের ১১২ সদস্যকে একসঙ্গে দাফন করা হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত এসব ফিলিস্তিনির মরদেহ গত মাসে উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার স্বজনদের উপস্থিতিতে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। সূত্র: মিডল ইস্ট আই
আবু শরিয়া ও আল-হাসায়না পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানাতে গাজা শহরে জড়ো হন। ফিলিস্তিনি পতাকায় মোড়ানো মরদেহগুলো সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর স্বজনদের দাফনের সুযোগ পেলেও পরিবারের সদস্যদের জন্য মুহূর্তটি ছিল একই সঙ্গে স্বস্তি ও গভীর শোকের।
হামলায় স্বজন হারানো আমের আবু শরিয়া মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, তিন বছর পর শহীদদের দাফন করতে পারছেন—এটি যেমন স্বস্তির, তেমনি ঘটনাটি যেন আবার নতুন করে তাদের শোকের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজার সাবরা মহল্লায় চালানো ওই হামলাকে দুই বছরব্যাপী সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ একক হামলাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান পুরো একটি আবাসিক ব্লক ধ্বংস করে দেয়, যেখানে আবু শরিয়া ও আল-হাসায়না গোত্রের শত শত মানুষ বসবাস করতেন এবং অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।
এই হামলায় ৪৪ শিশু, ৩৭ নারী এবং ১০ জনের বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন। অধিকাংশই ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়েছিলেন।
যুদ্ধের শুরুর দিকে পর্যাপ্ত ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকাজ কার্যত বন্ধ ছিল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জাম ইসরায়েল ধ্বংস করে দিয়েছিল অথবা গাজায় প্রবেশ করতে দেয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপের নিচেই রয়ে যায় নিহতদের মরদেহ।
গত ১৪ জুলাই সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিস্ফোরণের তীব্রতায় অনেক মরদেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে।
১ আগস্ট পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা ১১২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এখনও আরও অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।
গাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে টানা ১৭ দিন কাজ করে তারা ১১২ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করেছেন। তিনি জানান, গাজাজুড়ে এখনও হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন এবং তাদের পরিবার স্বজনদের উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে।
আবারও জেগে উঠল পুরোনো শোক
নিহতদের মধ্যে আবু শরিয়া গোত্রের মোখতার বা বয়োজ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি ফাথি আবু শরিয়াও ছিলেন। তার বাড়িতে হামলার পর বহু মানুষ আশ্রয় নেন মোফিদ আল-হাসায়নেহর বাড়িতে। তিনি ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের গণপূর্ত ও আবাসনমন্ত্রী ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বও ধারণ করতেন।
হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মাহমুদ আল-হাসায়নেহ জানান, পরিবারের প্রায় ২০০ সদস্য নিরাপদ মনে করে ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও বোমা হামলা চালানো হয়। এতে সাবেক মন্ত্রী মোফিদ আল-হাসায়নেহসহ আশ্রয় নেওয়া বহু মানুষ নিহত হন।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি হামলায় শিশু, নারী কিংবা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। নিহতদের মধ্যে রোমানিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও ছিলেন।
হামলার সময় মাহমুদ আল-হাসায়নেহ বাড়িতে ছিলেন না। তবে হামলায় তার ছেলে আহত হন। এছাড়া তিনি তার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান, দুই বোন ও তাদের সন্তানসহ আরও বহু আত্মীয়কে হারিয়েছেন।
তার ভাষায়, মরদেহ উদ্ধার ও দাফনের জন্য এত দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশেষ করে বিদেশে থাকা আত্মীয়দের জন্য প্রতিবার নতুন করে শোক ফিরে এসেছে। যখনই কোনো মরদেহ উদ্ধার করা হতো, বিদেশে থাকা স্বজনেরা ফোন করে কান্নায় ভেঙে পড়তেন।
তিনি বলেন, মৃতদের যথাযথভাবে দাফন করতে পারাই তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান।
এখনও নিখোঁজ হাজারো মানুষ
গাজার নিখোঁজ ব্যক্তি বিষয়ক সরকারি কমিটির প্রধান ওমর নোফাল জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬ হাজার মানুষকে সরকারিভাবে নিখোঁজ হিসেবে নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে তার ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ১৫ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে। কারণ এখনও গাজার বিভিন্ন স্থানে ধসে পড়া ভবনের নিচে অসংখ্য মানুষ চাপা পড়ে আছেন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও হাজারো মানুষের চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

