ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। সেই ধারাবাহিকতায় ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি অনির্দিষ্টকালের জন্য নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তেল বিক্রিই নয়, সেই বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, তার সিদ্ধান্তও নেবে ওয়াশিংটন।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানায়, বিশ্ববাজারে ভেনেজুয়েলার তেল বিপণন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ বিক্রি থেকে পাওয়া সব অর্থ প্রথমে বিশ্বস্বীকৃত ব্যাংকে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টে জমা হবে। বিভাগটির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিবেচনায় এই অর্থ মার্কিন ও ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে।
জ্বালানি বিভাগ আরো জানায়, প্রাথমিকভাবে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে।
এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প নিজে আরো এক ধাপ এগিয়ে বক্তব্য দেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, নতুন তেল চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলা যে অর্থ পাবে, তা দিয়ে তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্যই কিনতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, কেনাকাটার তালিকায় থাকবে আমেরিকান কৃষিপণ্য, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ভেনেজুয়েলার বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি।
এর আগে গত শনিবার ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই তেল বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা এল।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করার এবং দেশটির বিশাল তেল মজুতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মঙ্গলবার ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা ওয়াশিংটনকে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দেবে।
ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে এসব পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগ কৌশলের অংশ। মাদুরোর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও তিনি তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
এই চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আংশিক নৌ-অবরোধ আরোপ এবং একাধিক জাহাজ জব্দের ঘটনাও রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলায় তেল আনা-নেওয়ার কাজে যুক্ত ছিল। বুধবার সকালে মার্কিন বিশেষ বাহিনী উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে রাশিয়ার পতাকাবাহী জাহাজসহ ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট দুটি জাহাজ জব্দ করে।
ঠিক সেই সময়ই ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের ভেনেজুয়েলা-সংক্রান্ত পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং দিচ্ছিলেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক অ্যালান ফিশার জানান, অধিকাংশ রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে—এই অভিযান কতদিন চলবে, এতে কত ব্যয় হবে, সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না এবং ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে।
ডেমোক্রেটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ বিষয়ে ট্রাম্পের যে গোপন পরিকল্পনা রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের চেয়ে তেল কোম্পানির নির্বাহীরাই বেশি জানেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে সিনেটে অবিলম্বে গণশুনানির দাবি জানান।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন তিন ধাপের একটি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে, যাতে তা দুর্নীতি বা শাসকগোষ্ঠীর কাজে না গিয়ে জনগণের উপকারে আসে।
রুবিও বলেন, দ্বিতীয় ধাপে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে একটি ‘জাতীয় সমঝোতা প্রক্রিয়া’ শুরু হবে, যাতে বিরোধী নেতাদের সাধারণ ক্ষমা দিয়ে মুক্তি বা দেশে ফেরার পথ তৈরি করা যায়। তার ভাষায়, তৃতীয় ধাপটি হবে ক্ষমতা হস্তান্তর।
ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্বালানি বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ১৯৭০-এর দশকের আগের কনসেশনারি ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী দেশগুলো তেলের মালিক থাকলেও উৎপাদন ও বিপণনের নিয়ন্ত্রণ থাকত পশ্চিমা কোম্পানির হাতে এবং মুনাফার বড় অংশ তারাই পেত।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি দল সতর্ক করে বলেছে, ভেনেজুয়েলা ‘চালানো’ এবং দেশটির তেলের মজুত ব্যবহারের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তাদের মতে, এতে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক নীতি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুতসহ ভেনেজুয়েলার বিপুল সম্পদকে সামরিক আগ্রাসন, বিদেশি দখল বা সরকার পরিবর্তনের কৌশল বৈধ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
এদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান কর্মসূচির পরিচালক রেনাটা সেগুরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার বিষয়ে ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তার মতে, হয় তারা এসব শর্ত মেনে নিয়েছে, অথবা মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ দাবি করলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো বিদেশি শক্তি দেশটি শাসন করছে না।
সেগুরা বলেন, এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সরকারের ভেতরেই ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তীব্র আলোচনা চলছে। তার মতে, দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা এখনো অস্থির। তিনি সতর্ক করে বলেন, সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর হাতে অর্থনীতি ও রাজপথ—দুই ক্ষেত্রেই বড় ক্ষমতা রয়েছে। এমন সময় আসতে পারে, যখন তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সঙ্গে একমত নাও হতে পারে।

