ইরানের রাজনীতিতে আবারও নাম এসেছে রেজা পাহলভির, সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পুত্রের। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া রাজতন্ত্রের উত্তরসূরি এই রাজপুত্র দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকলেও এখন নিজেকে ইরানের বিরোধী আন্দোলনের সম্ভাব্য নেতৃত্বেরূপে উপস্থাপন করছেন।
সম্প্রতি বিক্ষোভে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন—‘এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবে’, ‘জাভিদ শাহ’ এবং ‘রেজা শাহ, আপনার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা’। প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল তেহরানের গ্র্যান্ড বাজার থেকে অর্থনৈতিক অসন্তোষের কারণে, কিন্তু দ্রুত তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত রেজা পাহলভি এই বিক্ষোভে অংশ নিতে দেশবাসীকে প্রকাশ্যে আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে ইরানে রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা এখনো নিষিদ্ধ, এবং এটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাহলভিকে ঘিরে এই নতুন উন্মাদনা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি চরম অসন্তোষের প্রতিফলন। লেখক ও গবেষক আরাশ আজিজি বলেন,
“রেজা পাহলভি অবশ্যই ইরানের বিরোধী রাজনীতিতে প্রভাব বাড়িয়েছেন এবং একজন ফ্রন্টরানার হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তিনি ঐক্যের প্রতীক নন; বরং তিনি বিভাজনমূলক চরিত্র।”
রেজা পাহলভি মাত্র ১৬ বছর বয়সে দেখেছেন তার পিতার ৪০ বছরের শাসনের পতন। দীর্ঘ নির্বাসনের পর ৬৫ বছর বয়সে এসে তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী পর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধীদের দমন করে আসছে। সাবেক প্রেসিডেন্টসহ বহু সমালোচক কারাবন্দি হয়েছেন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নির্বাচিত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা সীমিত রাখেন এবং যেকোনো চ্যালেঞ্জ কঠোরভাবে দমন করেন। এর ফলে প্রবাসী ইরানিদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিরোধী শক্তি ক্রমেই জোরালো হয়েছে।
পাহলভির একজন হাই প্রোফাইল সমর্থক হলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদিও কিছু আগ্রাসী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ইরানের বিরোধীদের মধ্যে আশা সৃষ্টি করেছে, বাস্তবে সেই আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি এখনো স্পষ্টভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দেননি। তবে বলেছেন, সরকার পতনের ক্ষেত্রে তিনি অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর প্রশ্ন তুলেছেন,
“অন্তর্বর্তী সরকারে কারা থাকবেন, কে নির্বাচনে দাঁড়াবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে বাস্তব পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাহলভিকে ঘিরে আসা সমর্থন মূলত ইরানের গভীর সংকটের ইঙ্গিত। দুর্নীতি, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেশকে নাকাল করেছে। তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাবে ক্ষুব্ধ। এই হতাশার মাঝেই অনেকেই অতীতের ইরানের প্রতি নস্টালজিয়া অনুভব করছেন।
ভালি নাসরের ভাষ্য,
“ইরানিরা পাহলভিকে বেছে নিচ্ছে তার উপস্থিতির কারণে নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে মরিয়া হয়ে। সেই হতাশা ও স্মৃতির রাজনীতিকেই কাজে লাগাচ্ছেন রেজা পাহলভি। তবে এখনও তিনি নিশ্চিত নন, তার জন্য সিংহাসন সত্যিই অপেক্ষা করছে কি না।”

