ব্রিটেনের নতুন অভিবাসন নীতি দেশটির অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করছে। সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের ফলে জাতীয় কোষাগারে বিশাল ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ ব্রিটিশ করদাতাদের ওপর। রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ‘সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘নেট জিরো মাইগ্রেশন’ স্লোগান জোরালো হচ্ছে, তখন অর্থনীতির বাস্তব হিসাব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অভিবাসন বিরোধী অবস্থান ২০২৬ সালের মধ্যেই কর বৃদ্ধির পথ তৈরি করতে পারে।
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, এক বছরে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ৬ লাখ ৪৯ হাজার থেকে কমে ২ লাখ ৪ হাজারে নেমে এসেছে। এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশ কম। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে ব্রিটেনের কোষাগারে প্রায় ২০ বিলিয়ন পাউন্ড রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারের সামনে সবচেয়ে সহজ পথ হবে কর বৃদ্ধি। ফলে বাড়তি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।
অভিবাসন কমার প্রভাব: চাপের মুখে এনএইচএস ও সেবা খাত:
ব্রিটেনে অভিবাসন বিরোধী প্রচারণাকে অনেকেই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব এখানে স্পষ্ট। তবে এই প্রচারণার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে একটি বাস্তবতা। ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতগুলো এখন অনেকটাই অভিবাসীনির্ভর।
জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএস, কেয়ার হোম এবং সোশ্যাল কেয়ার খাতে অভিবাসীরা বড় ভূমিকা রাখছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ কর্মীদের মধ্যে এই ধরনের কঠিন ও সেবামূলক কাজে আগ্রহ কমছে। ফলে অভিবাসীরা কারও কাজ কেড়ে নিচ্ছেন না। বরং যে শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, তা পূরণ করছেন। গত এক বছরে স্বাস্থ্য ও কেয়ার ভিসার সংখ্যা অর্ধেকে নামানোর পরও কর্মসংস্থান বাড়েনি। বরং সাধারণ মানুষের জন্য সেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে তীব্র জনবল সংকট।
৪০ বছরের নীতিহীনতা:
লন্ডনের চ্যান্সেরি সলিসিটর্সের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন রোববার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্রিটিশ অভিবাসন নীতির বড় ব্যর্থতা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। গত ৪০ বছরে কোনো সরকারই স্থায়ী ও সুসংগঠিত নীতি গড়ে তুলতে পারেনি। নতুন সরকার এলেই আগের নীতি বাতিল করে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে আবাসন ও সরকারি সেবার মতো খাতে টেকসই কাঠামো তৈরি হয়নি। এতে সামাজিক চাপ ও বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নীতি এই অস্থিরতারই উদাহরণ। ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন বা আইএলআর পাওয়ার সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বা ১৫ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে মেধাবী পেশাজীবীরা ব্রিটেনের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। যারা নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছেন এবং একবার আবেদনের জন্য ৩ হাজার ২৯ পাউন্ড ফি দিচ্ছেন, তাদের দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় রাখা অন্যায় বলেও মনে করছেন তিনি। এর ফলে আন্তর্জাতিক মেধারা ব্রিটেনের বদলে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের বাড়তি উদ্বেগ:
গত চার বছরে ব্রিটেন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় অনেক বাংলাদেশি ব্রিটেনে এসেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরেই কয়েক হাজার বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী, শিক্ষার্থী ও কেয়ার খাতের কর্মী হিসেবে দেশটিতে থিতু হয়েছেন। তবে বর্তমান কঠোর নীতি এবং আইএলআর-এর সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তে তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার ভয় শুধু কর্মীদের নয়। তাদের পরিবারের সদস্যরাও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। যারা ব্রিটিশ অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তারা প্রশ্ন তুলছেন—এত কর দেওয়ার পরও যদি স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে এই ত্যাগের মূল্য কোথায়?
সমাধানের পথ কী:
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ ‘ফেয়ার সেটেলমেন্ট’ নীতি। নির্দিষ্ট সময় কাজ ও কর দেওয়ার পর অভিবাসীদের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত থাকতে পারে, তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাতা বা ফান্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
এতে অভিবাসীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবেন। বাড়ি কেনা বা ব্যবসায় বিনিয়োগের নিরাপত্তা পাবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কল্যাণ খাতে বাড়তি চাপও পড়বে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতি ২০ বিলিয়ন পাউন্ডের সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া গেলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা কঠিন। জনবল সংকট ও কর আয় কমে গেলে এর মাশুল দিতে হবে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদেরই।

