ইরানে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশটির শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের মুখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ছে মানুষ। বিক্ষোভে অন্তত পাঁচ শতাধিক নিহত হয়েছেন বলে একটি মানবাধিকার সংগঠন বরাত দিয়ে জানিয়েছে রয়টার্স। বিক্ষোভ দমনে ‘গণহত্যা’র আশঙ্কা বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
তবে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে তারা প্রতিশোধ নেবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, বিক্ষোভে ৫৩৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ৪৯০ ও নিরাপত্তাকর্মী ৪৮ জন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে অন্তত ১০ হাজার ৬০০ জনকে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আলজাজিরা বলেছে, বিক্ষোভকারীদের গুলিতে ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন গতকাল রোববার জানায়, ইসপাহান প্রদেশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ৩০ সদস্য নিহত হয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী কমান্ড স্পেশাল ইউনিটের কমান্ডার বলেছেন, বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা দমনের অভিযানে নিরাপত্তা বাহিনীর আট সদস্য নিহত হয়েছেন।
আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা গতকাল জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভে ১০৯ নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, গোলেস্তান প্রদেশের রাজধানী গোরগানে তাদের একটি ত্রাণ ভবনে হামলায় এক কর্মী নিহত হয়েছেন।
গতকাল রোববার বিক্ষোভকালে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ছবি সম্প্রচার করেছে রাষ্ট্রীয় টিভি। দেশটির কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘দাঙ্গা সৃষ্টি’ ও ‘ভাঙচুর’ করার অভিযোগ তুলেছে। জাতীয় পুলিশপ্রধান আহমেদ রেজা রাদান বলেছেন, ‘শনিবার রাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।’ তবে গ্রেপ্তারকৃতদের প্রকৃত সংখ্যা বা পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এই অবস্থায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, শত্রুরা দেশে বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করতে চাচ্ছে। সরকার জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও তাদের কথা শুনতে প্রস্তুত।
দেশটির নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি বলেন, অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তারা দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। তাদের কর্মকাণ্ড সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলে যায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস বিক্ষোভের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করেছে। তারা ট্রাম্পকে ‘ভাঁড়’ ও ‘অপরাধী’ উল্লেখ করে বলেছে, ইরানের সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদকে ট্রাম্প সমর্থন করেন। হামলা হলে পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
বিবিসি জানায়, বেশ কয়েকটি হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, হতাহতদের সংখ্যা বাড়ায় তারা হতাশ। শুক্রবার রাতে রাশত শহরের একটি হাসপাতালে আনা হয় ৭০টি মৃতদেহ এবং তেহরানের একটি হাসপাতালে ৩৮ জন মারা গেছেন। বিবিসি পার্সিয়ান ছয় শিশুসহ নিহত ২৬ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। সংবাদমাধ্যমটি একটি মানবাধিকার গোষ্ঠীর বরাত দিয়ে বলেছে, ‘২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই হাজার ৫০০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
এএফপি জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান সরকারের যে কয়টি গণআন্দোলন হয়েছে, এই বিক্ষোভ অন্যতম। ইতোমধ্যে বিক্ষোভটি দুই সপ্তাহ ধরে চলমান। এই আন্দোলন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘লুটপাটকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সংস্থা নেটব্লকস মনিটরের তথ্যমতে, ইরানে ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এর মধ্যেই বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইন্টারনেটে বিঘ্ন ঘটনায় তথ্য প্রবাহ সীমিত হচ্ছে। এ কারণে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এএফপির যাচাই করা এক ভিডিওতে দেখা গেছে, শনিবার রাতে ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় তেহরান, মাশহাদসহ বেশ কয়েকটি শহরে নতুন বিক্ষোভে বিপুল সংখ্যক জনতা রাস্তায় আসে। তাতে যানবাহনে আগুন লাগানোর দৃশ্য দেখা গেছে। তবে যাচাই করা হয়নি এমন ভিডিওতে সরকারি বাহিনীর দমনপীড়নে কিছু মরদেহ দেখানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান (সিএইচআরআই) জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ থাকাকালে ইরানজুড়ে শত শত বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা অন্যান্য কর্মকর্তাও রয়েছেন।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরানজুড়ে মুদ্রা সংকটের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তারপর থেকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে। অনেক বিক্ষোভকারী দেশের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল। এই বিক্ষোভের মুখে দেশে অস্থিরতা দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। শুক্রবার তিনি বলেন, বিক্ষোভের মুখে সরকার পিছু হটবে না।
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চান ট্রাম্প
ট্রাম্প শনিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘ইরান স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, সম্ভবত এ চাওয়া আগের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত।’ এর আগে তিনি ইরানে হামলা করারও হুমকি দিয়েছিলেন। মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প ইরানের কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়াতে কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করছেন।
একজন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই পর্যায়ে বড় ধরনের হামলা বিক্ষোভকারীদেরই দুর্বল করে তুলতে পারে। এ কারণে কয়েকটি বিকল্প পদক্ষেপের কথা ভাবছে ওয়াশিংটন। সেগুলো হলো– ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি সৃষ্টি করতে রণতরী ভাসানো, সাইবার আক্রমণ, গোয়েন্দা তথ্য হ্যাক ইত্যাদি।
জনগণের উচিত দাঙ্গাবাজদের রুখে দেওয়া: পেজেশকিয়ান
তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দাঙ্গাকারীরা ইরানি সমাজকে সংকটে ফেলছে। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারক আইআরআইবিকে বলেন, ইরানের জনগণের উচিত দাঙ্গাবাজদের রুখে দেওয়া। জনগণের বিশ্বাস করা উচিত, সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যুক্ত। তারা বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে, মসজিদ পুড়িয়ে দিচ্ছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে হামলা করছে।
হামলা হলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হবে: স্পিকার
ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ শুরু করলে ইরান পাল্টা আক্রমণ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আক্রমণের ক্ষেত্রে দখলকৃত অঞ্চল এবং মার্কিন সামরিক ও জাহাজ চলাচলের কেন্দ্র উভয়ই আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।’ রাষ্ট্রীয় টিভিতে এক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এদিকে গতকাল রোববার বিক্ষোভকারীদের রাস্তা না ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বলেন, ‘আপনারা রাস্তা ছেড়ে যাবেন না। আমার হৃদয় আপনাদের সঙ্গে আছে। আমি জানি, আমি শিগগির আপনাদের পাশে থাকব।’
ইরানি সেনাবাহিনীর সতর্কতা
ইরানের সেনাবাহিনী শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা দেশের ‘জাতীয় স্বার্থ’ রক্ষা করবে। কারণ বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু দেশের কথামতো জননিরাপত্তাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। এ কারণে বিক্ষোভ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সর্বোচ্চ কমান্ডার-ইন-চিফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এই অঞ্চলে শত্রুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। পাশাপাশি ইরানের জাতীয় স্বার্থ, দেশের কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনসাধারণের সম্পত্তি সুরক্ষিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।
ইরানে হামলায় আরও সময় চান মার্কিন কমান্ডাররা
নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে শনিবার জানিয়েছে, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার জন্য প্রতিরক্ষা প্রস্তুত করতে এই অঞ্চলের কমান্ডাররা আরও সময় চাইছেন। শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই তথ্য দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তেহরানের সরকার যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, তাহলে ইরানকে শাস্তি দেওয়া হবে।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি জানিয়ে ওই কর্মকর্তারা বলেন, ইরানের বিক্ষোভের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প হামলার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছেন।
বিক্ষোভের সূত্রপাত কী কারণে
বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক চাপের পর গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে ইরানি মুদ্রার মান কমে যায়। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরান বিশ্বের সবচেয়ে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে তেহরান আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে প্রবেশাধিকার পেতে হিমশিম খাচ্ছে।
আমদানির ওপর দেশটির ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে এবং মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। রোববার এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়াল ১৪ লাখ ২০ হাজারে নেমে এসেছে। মাত্র ছয় মাসে ৫৬ শতাংশ মূল্য হ্রাস পেয়েছে। ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতিতে খাদ্যের দাম বেড়েছে গত বছরের তুলনায় গড়ে ৭২ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্যের দাম ছয় গুণ এবং অন্যান্য পণ্যের দাম ১০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। এই বিক্ষোভ এখন ক্রমেই রাজনৈতিক ও সরকারবিরোধী হয়ে উঠছে।

