মার্কিন প্রশাসন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিউইয়র্কে নিয়ে গেছে—এমন খবর প্রথম শোনায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ হস্তক্ষেপের ইতিহাসের ধারাবাহিক এক নতুন অধ্যায় মাত্র। ঘটনার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনিজুয়েলাকে এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রই চালাবে। বিস্ময়কর এই ঘোষণার ভেতরে লুকিয়ে আছে পরিচিত এক ছক—যা অতীতেও বহুবার প্রয়োগ হয়েছে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায়।
লাতিন আমেরিকায় মার্কিন হস্তক্ষেপ নতুন নয়। এই অঞ্চলে নিজেদের পছন্দের সরকার বা নেতৃত্ব বসানোকে যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই এক ধরনের অলিখিত অধিকার হিসেবে দেখে এসেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই প্রবণতা আরও প্রকাশ্য ছিল। তখন ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র মোড়কে সমাজতন্ত্র ঠেকানোই ছিল ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য। যুক্তি দেওয়া হতো, সমাজতন্ত্র নাকি গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে বাধা। ফলে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপকে গণতন্ত্র রক্ষার মহান উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।
কিন্তু ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে গল্পটা একটু ভিন্ন। এখানে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাষা খুব একটা ব্যবহার করেনি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ছিল নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে—এটাই তার বড় রাজনৈতিক অপরাধ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাকে সেই অভিযোগে আটক করেনি। বরং একটি সাজানো মাদক পাচারের মামলায় অভিযুক্ত করে তাকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভেনিজুয়েলার বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এদমুন্দো গনসালেস কিংবা বিরোধী দলের অন্য কোনো নেতাকে সামনে এনে ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র দেখাচ্ছে না।
বরং ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে ‘ভালো মানুষ’ বলে উল্লেখ করলেও তার প্রতি ভেনিজুয়েলার জনগণের সমর্থন নেই—এমন তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। অথচ ২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রীকে গত মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ভেনিজুয়েলা থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, আত্মগোপনে থাকা মাচাদোকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ করে দিতেই এই উদ্যোগ। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। একজন জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী বিরোধী নেত্রীকে দেশীয় রাজনীতি থেকে কার্যত সরিয়ে দিয়ে ভেনিজুয়েলার ওপর সরাসরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার করাই ছিল আসল উদ্দেশ্য।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে, ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত? ট্রাম্প দাবি করছেন, এই অভিযানের পেছনে অর্থনৈতিক লাভ—বিশেষ করে ভেনিজুয়েলার তেল—প্রধান বিবেচ্য। তিনি প্রকাশ্যেই ভেনিজুয়েলার জ্বালানি সম্পদ মার্কিন কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকায় বহুবার অনুগত শাসক বসিয়েছে। তবু বাস্তবতা হলো, স্বল্পমেয়াদে ভেনিজুয়েলার তেল থেকে বড় মুনাফা আদায় সম্ভব নয়। উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিপুল বিনিয়োগ, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অসম্ভব।
এখানে দ্বিতীয় বড় নজির হিসেবে সামনে আসে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ। সেই যুদ্ধ ছিল মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের এক বড় মোড়। জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের বিশ্বাস ছিল, একটি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা, একজন স্বৈরশাসককে উৎখাত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিলেই গণতন্ত্র আপনাআপনি গড়ে উঠবে। ইরাকের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তখন কার্যত কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনাই ছিল না। ফলাফল ছিল ভয়াবহ। লাখ লাখ ইরাকি প্রাণ হারান, নিহত হন প্রায় সাড়ে চার হাজার মার্কিন নাগরিক। শেষ পর্যন্ত যাদের উৎখাত করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রকেই তাদের সঙ্গে আপস করতে হয়। এই অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বজুড়ে গভীর আস্থার সংকট তৈরি করে।
ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিভ্রম কাজ করছে। শুধু একজন শাসককে সরালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে—এই ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেলেও ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী পরাজিত হয়নি, তার সরকারও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা হলো ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা। কিন্তু সমস্যাটি হলো, রদ্রিগেজ নিজেও সহিংসতার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এমনকি তিনি মাদুরোর অপহরণকে অবৈধ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং এটিকে ‘জায়নিস্ট আচরণের প্রতিরূপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয় উদাহরণ হিসেবে চোখে পড়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন। ট্রাম্প যখন মাদুরোকে ধরে আনার ঘটনাকে ‘দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান’ বলেন, তখন তা ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলার ঘোষণা দিতে গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যবহৃত ভাষার প্রতিধ্বনি মনে হয়। পুতিন আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে আগ্রাসন চালিয়েও সেটিকে জাতিসংঘ সনদ দ্বারা বৈধ বলে দাবি করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন কার্যত অকার্যকর। ভেনিজুয়েলায় অভিযানের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা না দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সেই বিপজ্জনক প্রবণতাকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
ভেনিজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপকে তাই কার্যত যুদ্ধই বলা যায়—যদিও সেটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক দখল নয়। এটি মূলত সিআইএর দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল, যা মার্কিন সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাস্তবায়িত হয়েছে। ট্রাম্প যখন একে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা’ বলে বর্ণনা করেন, তখন তা অতিরঞ্জিত শোনায়। তবে এই ভাষা আমাদের চতুর্থ ও শেষ ঐতিহাসিক নজিরটির দিকে ইঙ্গিত দেয়—ফ্যাসিবাদী শাসনের বৈধতা তৈরির কৌশল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি, ইতালি ও রোমানিয়ার ফ্যাসিবাদী শাসকেরা নিজেদের দমনমূলক শাসনকে বৈধতা দিয়েছিল যুদ্ধ, ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ শত্রুর গল্প তৈরি করে। বিরোধীদের বিদেশি শক্তির দালাল হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তোলাও সেই পুরোনো কৌশলের আধুনিক সংস্করণ। মাদক ব্যবসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের গল্প জুড়ে দিয়ে ট্রাম্প সহজেই এমন এক বয়ান তৈরি করেছেন, যেখানে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। এই ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’ আবার যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো কঠোর করার অজুহাত হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে—যেমন নিরাপত্তার ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক অভিবাসনের মতো নীতির পক্ষে সমর্থন আদায়।
সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকৃত যুদ্ধের ঝুঁকি না নিয়েই যুদ্ধের রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছেন। তার বর্ণনায় ভেনিজুয়েলায় অভিযান এক ‘নিখুঁত সামরিক সাফল্য’, এবং সেখানেই গল্প শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পুতিন জানেন, ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখতে বাস্তব যুদ্ধ দরকার। ট্রাম্প সেই পথে যেতে হয়তো অনিচ্ছুক, নয়তো রাজনৈতিকভাবে অক্ষম—কারণ নিজ দেশেই তিনি দুর্বল অবস্থানে। ফলে তার এই ‘নিখুঁত অভিযান’ ভেনিজুয়েলার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরই বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ভেনিজুয়েলা নয়, প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। মার্কিন জনগণ যদি ভেনিজুয়েলায় এই অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন, তবেই তারা তাদের দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে আরও এগিয়ে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

